২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) কৃষি খাতে ১৮.৩৩ শতাংশ বাজেট কমানোর প্রভাব সরাসরি পড়বে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি চাহিদা এবং লাখ লাখ খামারির জীবিকা বিপন্ন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটের সময়েও এই দুই খাতে কার্যকর ও সুষম বরাদ্দ না থাকলে দেশের ভোক্তা ও উৎপাদক উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতীয় পুষ্টি চাহিদার ভার বহন করে যে খাতঃ বাংলাদেশের প্রোটিন চাহিদার একটি বিশাল অংশ আসে মৎস্য, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খাত থেকে। বিগত এক দশকে দেশীয় মাছ ও দুগ্ধ উৎপাদনে অভাবনীয় অগ্রগতি হয়েছে। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদক দেশের মধ্যে অন্যতম। প্রাণিসম্পদ খাতেও দেশ মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিপিআইসিসির তথ্য মতে, বর্তমানে বাৎসরিক মাথাপিছু ডিম খাওয়া হচ্ছে ১৩৬টি। এছাড়া, বাৎসরিক মাথাপিছু মুরগির মাংস খাওয়া হচ্ছে ২৬ কেজি। কিন্তু বাজেট কমে গেলে এই উন্নয়ন অর্জনগুলো টেকসই রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে প্রাণিসম্পদ খাতে রোগ প্রতিরোধ, খামার ব্যবস্থাপনা এবং বংশ উন্নয়ন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংকটে পড়বেন খামারিরাঃ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ৬০ লাখের বেশি মানুষ জড়িত, যারা দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। বাজেট সংকোচনের কারণে এই খাতের প্রশিক্ষণ, ঋণ সহায়তা, উপকরণ ভর্তুকি এবং বাজার সম্প্রসারণ কার্যক্রমে কাটছাঁট হতে পারে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ঘাটতির আশঙ্কাঃ প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ কমে গেলে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। অতীতে এনথ্রাক্স, বার্ড ফ্লু, পিপিআর ইত্যাদি রোগে লাখ লাখ প্রাণিসম্পদ নষ্ট হয়েছে। বাজেট সংকোচনের কারণে ভেটেরিনারি সেবা, টিকাদান কর্মসূচি ও জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মৎস্য খাতেও ভাইরাল রোগ ও জলজ পরিবেশ দূষণ একটি বড় সমস্যা। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে মাছের উৎপাদনে বড় ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা কমে যাবেঃ বাংলাদেশের চিংড়ি, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন মাছ রপ্তানি করে প্রতিবছর দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করে। এই খাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং EU ও USA এর স্ট্যান্ডার্ডে উন্নয়ন করতে নিয়মিত গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা দরকার। বাজেট কমিয়ে দিলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। নারীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারেঃ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে মৎস্য ও পশুপালন খাতের ভূমিকা অনন্য। নারী খামারিরা গরু পালন, হাঁস-মুরগি ও পুকুরে মাছ চাষের মাধ্যমে আয় করছেন। বাজেট কমে গেলে নারীর আর্থিক স্বাধীনতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে কৃষি খাতে ব্যাপক কাটছাঁটের ছায়া সরাসরি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও পরবে। পুষ্টি, জীবিকা, রপ্তানি—সব দিক থেকেই এই খাতগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ হ্রাস নয়, বরং টার্গেটেড ইনভেস্টমেন্ট ও কাঠামোগত সংস্কার দরকার। অন্যথায়, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। |