ডিম পাড়া মুরগির পেটে চর্বি সমস্যা: কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

পোলট্রি খামারে ডিম উৎপাদন বাড়াতে গেলে মুরগির পুষ্টি, পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হয়। তবে অনেক সময় দেখা যায়, ডিম পাড়া মুরগির পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমে, যা একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এ ধরনের চর্বি জমা শুধুমাত্র মুরগির শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায় না, বরং ডিম উৎপাদন হ্রাস, হঠাৎ মৃত্যু এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মূলত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, হরমোনের ভারসাম্য, পরিবেশগত চাপ ও বংশগত বৈশিষ্ট্য – এসব উপাদানের প্রভাবেই চর্বি জমার প্রবণতা দেখা দেয়। এই সমস্যার পেছনের কারণগুলো ভালোভাবে বোঝা গেলে তা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। এই আলোচনায় আমরা মুরগির পেটে চর্বি জমার প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করব এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোকপাত করব।

ডিম পাড়া মুরগির পেটে চর্বি জমা (Fatty Liver Syndrome বা Abdominal Fat Deposition) একটি সাধারণ কিন্তু গুরুতর সমস্যা, যা মুরগির উৎপাদনক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিচে এই সমস্যার প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. অতিরিক্ত ক্যালোরি (Excess Energy in Diet)

মুরগির খাদ্যে যদি অতিরিক্ত ক্যালোরি থাকে, বিশেষ করে অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি, তবে সেগুলো দেহে জমে চর্বিতে পরিণত হয়।
বিশেষত:

  • ভুট্টা, সয়াবিন তেল, রাইস ব্রান ইত্যাদি বেশি দিলে অতিরিক্ত শক্তি তৈরি হয়।
  • এই অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহৃত না হলে তা লিভার ও পেটের চারপাশে চর্বি হিসেবে জমা হয়।

২. খাদ্যে প্রোটিনের ঘাটতি (Protein Deficiency)

  • প্রোটিনের অভাবে শরীর সঠিকভাবে টিস্যু গঠন করতে পারে না, ফলে অতিরিক্ত শক্তি চর্বিতে রূপান্তরিত হয়।
  • প্রোটিনের সঠিক অনুপাত না থাকলে মেটাবলিজম ব্যাহত হয়।

৩. পর্যাপ্ত ব্যায়ামের অভাব (Lack of Physical Activity)

  • খাঁচায় পালিত মুরগির চলাফেরা সীমিত থাকে। ফলে তারা অতিরিক্ত ক্যালোরি ব্যবহার করতে পারে না।
  • এই কারণে চর্বি পেটে জমা হয়।

৪. অতিরিক্ত বা অনিয়মিত খাদ্য সরবরাহ (Overfeeding or Irregular Feeding)

  • যদি একবারে বেশি খাবার দেয়া হয়, মুরগি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খায় এবং অতিরিক্ত শক্তি চর্বিতে পরিণত হয়।
  • সময়মতো বা পরিমিত খাবার না দিলে মুরগির খাওয়ার অভ্যাস নষ্ট হয়ে যায়।

৫. খাদ্যে ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি (Deficiency of Key Nutrients)

বিশেষত:

  • কোলিন (Choline), মেথিওনিন (Methionine), ভিটামিন E, সেলেনিয়াম ইত্যাদি লিভার ফাংশনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
  • এসব উপাদানের ঘাটতি লিভারে চর্বি জমাকে ত্বরান্বিত করে।

৬. উচ্চ তাপমাত্রা বা তাপমাত্রার চাপ (Heat Stress)

  • গরমে মুরগির খাদ্য গ্রহণ কমে যায় কিন্তু পানি পান বেড়ে যায়।
  • এতে তাদের মেটাবলিজম পরিবর্তিত হয়ে যায়, এবং ফ্যাট জমার প্রবণতা বাড়ে।

৭. বংশগত বৈশিষ্ট্য (Genetic Predisposition)

  • কিছু মুরগির জাত যেমন Hy-Line, Lohmann Brown ইত্যাদি ডিম উৎপাদনে খুব কার্যকর হলেও তারা অতিরিক্ত ফ্যাট জমাতে পারে।
  • এই জাতগুলোতে ব্যবস্থাপনা আরও সতর্কভাবে করতে হয়।

ডিম পাড়া মুরগির পেটে চর্বি জমা প্রতিরোধের উপায়:

ব্যবস্থা ব্যাখ্যা
সুষম খাদ্য দিন প্রোটিন, ক্যালোরি, ভিটামিন এবং মিনারেল সঠিক অনুপাতে দিন
নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ একবারে বেশি না দিয়ে দিনে ২-৩ ভাগে ভাগ করে খাওয়ান
চলাফেরার ব্যবস্থা খাঁচার আকার বৃদ্ধি বা ফ্রি-রেঞ্জ পদ্ধতির চিন্তা করুন
হিট স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ পানি, ছায়া ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করুন
অতিরিক্ত ওজন পর্যবেক্ষণ মুরগির ওজন নিয়মিত মাপুন এবং প্রয়োজনে খাদ্য কমান
লিভার সাপোর্ট টনিক ব্যবহার যেমন: Livoliv, Hepatocare ইত্যাদি

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ডিম পাড়া মুরগির পেটে চর্বি জমা একটি ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যা, যা সচেতনতা, সঠিক পুষ্টি পরিকল্পনা ও পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সহজেই প্রতিরোধযোগ্য। এই সমস্যাটি অবহেলা করলে শুধু উৎপাদন কমে যায় না, বরং মুরগির স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মৃত্যুহারও বেড়ে যায়, যা খামারের জন্য অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই খামার পরিচালনার সময় খাদ্যের মান, পরিমাণ, পুষ্টি উপাদান ও পরিবেশগত চাপের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরামর্শ অনুযায়ী লিভার সাপোর্ট বা খাদ্য সম্পূরক ব্যবহার করাও অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। সচেতন খামারি ও সঠিক ব্যবস্থাপনাই পারে মুরগির সুস্থতা ও খামারের লাভজনকতা নিশ্চিত করতে।