তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদ হাসান: নিরাপদ আম চাষে কৃষির নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত

ফলচাষ, বিশেষ করে আম উৎপাদন, বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমের মৌসুমকে কেন্দ্র করে যে বিপুল উৎপাদন, বিপণন ও রপ্তানি কার্যক্রম চালু হয়, তাতে তরুণ উদ্যোক্তাদের ভূমিকা দিন দিন আরও জোরদার হচ্ছে।

বর্তমানে তরুণরা শুধু আম চাষেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা এই পুরো উপখাতকে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসায় রূপ দিচ্ছে। অনেক তরুণ আমবাগান গড়ে তুলছে আধুনিক পদ্ধতিতে। তারা কলম করা উন্নত জাতের চারা রোপণ, ফার্মিং টেকনিকস, সেচ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কীটনাশক ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে সেই অনুযায়ী চাষাবাদ করছে। এতে ফলন যেমন বাড়ছে, তেমনি গুণগত মানও বজায় থাকছে।

তরুণ উদ্যোক্তারা আম চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার করে কাজকে আরও সহজ ও লাভজনক করে তুলেছে। অনেকে ড্রোন দিয়ে বাগানে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছে, কেউ আবার মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে বাগানের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। এ ছাড়া, অনেক তরুণ ফল সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনায়ও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তরুণরা আম বিপণনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের কাছে নিরাপদ, রাসায়নিকমুক্ত আম পৌঁছে দিচ্ছে। এতে শহরের ভোক্তারা বিশ্বস্তভাবে কৃষকের কাছ থেকে আম সংগ্রহ করতে পারছে এবং কৃষকও পাচ্ছে ন্যায্য দাম। এই ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থায় তারা ছবি, ভিডিও, কাহিনি ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।

অনেকে আবার আম প্রক্রিয়াজাতকরণেও যুক্ত হয়েছে—যেমন শুকনো আম, আমের আচার, জ্যাম, আমসত্ত্ব ইত্যাদি তৈরি করে ভোক্তাদের কাছে নতুন পণ্য সরবরাহ করছে। এসব কাজের মাধ্যমে তারা শুধু আয়ের পথ তৈরি করছে না, বরং গ্রামের নারীদেরকেও এই কার্যক্রমে যুক্ত করে স্বনির্ভরতার সুযোগ সৃষ্টি করছে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, আমের মৌসুমে ফলচাষ ও বিপণনের প্রতিটি স্তরে তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ কৃষি খাতকে নতুন গতি ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। তারা কৃষিকে আধুনিক ও টেকসই করার পাশাপাশি দেশীয় বাজারে আমের গুণগত মান উন্নয়ন ও বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

তেমনি একজন তরুন উদ্যোক্তা কৃষিবিদ জাহিদ হাসান। তিনি রাজশাহী থেকে নিরাপদ ও রাসায়নিক মুক্ত আম সরাসরি ভোক্তার নিকট পৌঁছে দিচ্ছে। তার ও তার আমের রাজ্য সম্পর্কে আলাপচারিতার চুম্বক অংশ নিচে তুলে ধরা হলোঃ

ফিড নিউজঃ আপনার সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ আমি কৃষিবিদ জাহিদ হাসান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে এগ্রো ফার্ম নিয়ে কাজ করছি। আমার বাসা রাজশাহীতে।

ফিড নিউজঃ আপনি কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ আমি গ্রামের ছেলে। কৃষির সাথে আমার ফ্যামিলি অনেক আগে থেকেই জড়িত। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে কৃষি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এসেছে। অবারিত সম্ভাবনাময় কৃষি সেক্টরে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। আমি এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাই, এইজন্য কৃষি উদ্যোক্তা হতে চেয়েছি।

ফিড নিউজঃ কবে ও কীভাবে আপনার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ আমার ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই কৃষি নিয়ে আমার কাজ করা শুরু হয়েছিলো। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রয়োজনের তাগিদেই আমার উদ্যোক্তা জীবনের শুরু।

ফিড নিউজঃ পরিবার বা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল শুরুতে?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ শুরু থেকে আমার পরিবার অনেক সাপোর্টিভ ছিলো কিন্তু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অন্য রকম ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে সবাই যেখানে চাকরির স্বপ্ন দেখে সেখানে আমি কেন এসব করছি? এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে অনেকবার।

ফিড নিউজঃ কৃষির এত উপখাত থাকতে আম চাষ ও বাজারজাতকরনে কে যুক্ত হলেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ কৃষির সব খাত নিয়েই আমার কাজ করার ইচ্ছা। যেহেতু আমার বাসা রাজশাহীতে আর নিজেদের বাগানও আছে সেহেতু আম নিয়ে কাজ করা আমার জন্য সহজ হয়েছে।

ফিড নিউজঃ আপনার উদ্যোগের বিশেষত্ব কী?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ আমি কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় করে কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমার অর্জিত জ্ঞানের বাস্তবিক প্রয়োগ করছি এটাই আমার উদ্যোগের বিশেষত্ব।

ফিড নিউজঃ আপনি আম চাষে কোন প্রযুক্তি বা আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ হ্যা ব্যবহার করছি। জাত বাছাই থেকেই আম উৎপাদন সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি।

ফিড নিউজঃ উদ্যোক্তা হিসেবে এখন পর্যন্ত কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ কৃষি নিজে কাজ মানেই চালেঞ্জিং। অনেক সময় আমরা কাঙ্খিত ফলন পাই না। নতুন রোগ বালাই সামনে আসে এসব মোকাবিলা করতে হয়।

ফিড নিউজঃ শুরুতে মূল প্রতিবন্ধকতা কী ছিল? তা কিভাবে মোকাবিলা করেছেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ শুরুতে অনেক কিছু বুঝতাম না। ইনভেস্ট না থাকা একটা বড় সমস্যা ছিলো। আস্তে আস্তে সময় নিয়ে ইনভেস্ট ম্যানেজ করেছি, আলহামদুলিল্লাহ।

ফিড নিউজঃ সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা পেয়েছেন বা পান?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ কৃষি অফিস থেকে আমরা নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করি। তাছাড়া সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন থেকে তেমন সহযোগিতা পাইনি।

ফিড নিউজঃ আপনার সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনটি বলে মনে করেন?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ নিজের পাশাপাশি কয়েকজনের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পেরেছি এটাই আমার সফলতা।

ফিড নিউজঃ এই যাত্রায় আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে কে বা কী?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র বড় ভাই আপুরা এবং শ্রদ্ধেয় স্যাররা।

ফিড নিউজঃ আপনার উদ্যোগে কতজন লোক এখন কাজ করে?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ বর্তমানে প্রতি সিজনে ১২-১৫জন লোক কাজ করে।

ফিড নিউজঃ ভবিষ্যতে আপনার উদ্যোগকে কীভাবে সম্প্রসারণ করতে চান?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ এগ্রো বেজড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। নিজেদের উৎপাদিত পন্যের বিপনন ব্যবস্থা নিজেরাই করতে চাই।

ফিড নিউজঃ নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে। প্রতিবন্ধকতা আসবে সমস্যা থাকবে সব কিছুকে জয় করেই সামনে আগাতে হবে।

ফিড নিউজঃ আপনি কী মনে করেন—তরুণদের জন্য কৃষি খাত কতটা সম্ভাবনাময়?

কৃষিবিদ জাহিদ হাসানঃ হ্যাঁ অবশ্যই। বর্তমানে অনেক তরুণ আধুনিক প্রযুক্তি সাথে কৃষি নিয়ে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এই খাত অনেক সম্ভাবনাময়।

 উপস্থাপিত আলাপচারিতাটি থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, কৃষিবিদ জাহিদ হাসানের মতো তরুণ উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের কৃষি খাতের ভবিষ্যৎ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। আম চাষের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্রকে আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ছোঁয়ায় নতুন মাত্রায় নিয়ে গিয়ে তারা শুধু নিজেদের আত্মনির্ভরশীল করছেন না, বরং সমাজের অন্যান্য মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকেও স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে দিচ্ছেন। কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সাহসিকতা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার যে সমন্বয় জাহিদ হাসান বাস্তবায়ন করছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের অন্যান্য তরুণদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কৃষি যে কেবল খাদ্য উৎপাদনের একটি মাধ্যম নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা—এ সত্য প্রতিষ্ঠা করছেন এই প্রজন্মের উদ্যমী উদ্যোক্তারা।