বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৫ উপলক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়াধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১ জুন ২০২৫ তারিখে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ উপলক্ষে রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন (কেআইবি) অডিটোরিয়ামে “বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৫ উদযাপন” অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) এ আয়োজনে সহযোগিতা প্রদান করছে। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ আবু সুফিয়ান। অন্যান্য দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ড. খালেদা ইসলাম, প্রফেসর, ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন এন্ড ফুড সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ড. রায়হান হাবিব, প্রফেসর, ডেইরি বিভাগ, বাকৃবি, ময়মনসিংহ; ড. আরিফুল ইসলাম, প্রফেসর, মাইক্রোবায়োলজি এন্ড হাইজিন বিভাগ, বাকৃবি, ময়মনসিংহ; খামারী প্রতিনিধিদের মধ্যে মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, সভাপতি, বাংলাদেশ ডেইরী এন্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স এসোসিয়েশন; এ.এস.এম আনোয়ার উল্লাহ, প্রোপাইটর, প্যারাডাইস ডেইরী, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা এবং প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, অন্যান্য ডেইরী উদ্যোক্তা, খামারী ও সুধীবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
বিশ্ব দুগ্ধ দিবস উদযাপন শুরু করা হয় ২০০১ সাল থেকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার উদ্যোগে। প্রতি বছর ১লা জুন বিশ্ব দুগ্ধ দিবস উদযাপিত হয়। দুধ ও দুধজাত পণ্যকে নিরাপদ পুষ্টির অন্যতম উৎস্য হিসেবে সকল মহলে জনপ্রিয় করা, সেক্টরের উন্নয়নে জনাকর্ষণ বাড়ানো, বিনিয়োগ আকর্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রচারনার জন্য বাংলাদেশে এই দিবস পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ডাঃ মোঃ জসিম উদ্দিন, প্রকল্প পরিচালক, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প। তিনি তার বক্তব্যে বিশ্ব দুগ্ধ দিবস উপলক্ষে দেশ ব্যাপী নানা আয়োজনের কথা তুলে ধরেন। “দুগ্ধের অপার শক্তিতে, মেতে উঠি এক সাথে” এবারের বিশ্ব দুগ্ধ দিবসের এ প্রতিপাদ্যের উপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডাঃ মোঃ বয়জার রহমান, পরিচালক, প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তিনি তার প্রেজেন্টেশনে দুধের নানাবিধ উপকার নিয়ে আলোচনা করেন। দুগ্ধ দিবসের এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সকাল ৮.৩০ ঘটিকায় রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাথমিক শাখার ছাত্র ছত্রীদের স্কুল মিল্ক ফিডিং এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। দিবসটি উপলক্ষে সকাল ৯.৩০টায় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি র্যালি আয়োজন করা হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে র্যালিটি মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ হয়ে কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশনে এসে র্যালি শেষ হয়। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ঢাকার ১১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কুল মিল্ক ফিডিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এর লক্ষ্য হল দুধের উপকারিতা, পরিবেশের উপর এর প্রভাব এবং বিশ্বব্যাপী দুগ্ধ খাতের অগ্রগতি প্রচার করা। শিশুদের জন্য এটি হাড়, পেশী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং শক্তির স্তরের উপকারিতা অর্জনের মাধ্যমে কিভাবে এটি বেড়ে ওঠা শিশুদের সহায়তা করে তা নিয়ে। র্যালি শেষে শুরু হয় মূল আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে প্রধান অতিথি বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতে অধিকতর সহায়তা ও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। সরকার তা নিয়ে পরিকল্পনায় আছে। তিনি আরও বলেন, দুধ এখন আর শুধু একটি খাদ্য নয়—এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “দুধ ও ভাত আমাদের সমাজে মায়ের মমতার প্রতীক, আমাদের শিশুদের পুষ্টির আশ্বাস।” তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার যোদ্ধারা যাঁরা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের জীবনধারার উন্নয়নে আমাদের উদ্যোগী হতে হবে। তাঁদের কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার টন গুঁড়ো দুধ বিদেশ থেকে আমদানি করে, যার ফলে দেশ থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের নিজেদের দেশে উন্নত মানের তরল ও গুঁড়ো দুধ উৎপাদনে জোর দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যদি কৃষিক্ষেত্রে সরকার নানা ধরনের ভর্তুকি ও সহায়তা দিতে পারে, তাহলে প্রাণিসম্পদ এবং খামারি সমাজকেও সেই সুযোগের আওতায় আনা উচিত।” তিনি আরও জানান, আশেপাশের দেশগুলোতে মহিষের দুধের উৎপাদন অনেক বেশি। যদিও আমাদের দেশে তা তুলনামূলক কম ব্যবহৃত হয়, তারপরও এতে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ছাগলের দুধও এক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, যার রয়েছে ওষুধি গুণ। এইসব বিষয় মাথায় রেখে সরকার দুধ উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পরিকল্পনা নিচ্ছে। সভাপতির বক্তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ আবু সুফিয়ান একটি উন্মুক্ত আলোচনা পরিচালনা করেন। তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত খামারিদের কথা বলার সুযোগ দেন। খামারিরা তাঁদের নানা সমস্যার কথা উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এর নিকট উপস্থাপন করেন। সভা শেষে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ আবু সুফিয়ান আগত সকলকে শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠানে আরও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. খালেদা ইসলাম, ড. রায়হান হাবিব, ড. আরিফুল ইসলাম, খামারী প্রতিনিধিদের মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, এ.এস.এম আনোয়ার উল্লাহসহ আরও অনেকে। দুগ্ধ উৎপাদন সংক্রান্ত বিষয়ে এলডিডিপির আওতায় চার হাজারের অধিক ডেইরী পিজি কার্যক্রম চলমান, এবং প্রতি পিজিতে ৪০ জন খামারী রয়েছে, যার মধ্যে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মত। এসব পিজি সদস্য জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ পেয়েছে, হাইজিন উন্নত করার জন্য উপকরণ সহায়তা পেয়েছে, পিজিতে দুধ দোহনের মেশিন ও খড়/ঘাস কাটার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে ও হচ্ছে; দুধ বাজারে সংযোগ স্থাপনের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে দুগ্ধ প্রসেসিং ও মার্কেটিং উদ্যোক্তাদের জন্য ম্যাচিং গ্রান্ট বিতরণ করা হচ্ছে। দুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাসহ মেধা বিকাশের জন্য উক্ত প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনী হিসেবে ৩০০ টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে দুধ পান করানো কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকারি ডেইরী খামারগুলোর উন্নয়নের জন্য ডেইরী ট্রেনিং হল নির্মাণ, খামারের শেড সংস্কার, নতুন নতুন বকনা সরবরাহ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, উপজেলা পর্যায়ে দুধের মান পরীক্ষার জন্য মিল্ক এনালাইজার বিতরণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে এলডিডিপি। ডেইরী উন্নয়ন বোর্ড স্থাপন বিষয়ে কার্যক্রম রয়েছে এলডিডিপি। ঢাকার বাইরেও এলডিডিপি প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৬১টি জেলায় বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৫ উপলক্ষ্যে নেয়া হয় নানামুখী কর্মসূচি। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়/এতিমখানার শিশুদের দুধ খাওয়ানো, কুইজ কম্পিটিশন, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, র্যালি ও সভা আয়োজন এবং পুরষ্কার বিতরণ করা হয়। দুগ্ধ দিবসের এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা প্রদানে এগিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মিল্কভিটা, প্রাণ ডেইরি, আকিজ ডেইরি, আমেরিকান ডেইরি লিঃ এবং রংপুর ডেইরি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও প্রকল্পের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং প্রাণিসম্পদ খাতের বিজ্ঞানী-গবেষক, উদ্যোক্তা ও খামারিগণ দিনব্যাপী আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। |
দেশব্যাপী বিশ্ব দুগ্ধ দিবস ২০২৫ উদযাপিত
