ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক দরপতনের ফলে খামারিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। অনেকেই টিকে থাকতে না পেরে মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এই সংকট মোকাবিলায় প্রান্তিক খামারিদের রক্ষায় ৬ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)।
আজ রাজধানীর একটি হোটেলে পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়। ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এবং বিপিআইসিসি যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে। বিপিআইসিসির ৬ দফা প্রস্তাব: ১. স্বল্পসুদে ঋণ নিশ্চিত করা ২. ডিম-মুরগির সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ ৩. কোল্ডস্টোরে ডিম সংরক্ষণের সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ৪. অফ-সিজনে খামারিদের জন্য ভর্তুকি দেওয়া ৫. ফিডের দাম কমাতে AIT, TDS, VDS হার শূন্যে নামিয়ে আনা ৬. ডিম-মুরগির উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য একটি সুস্পষ্ট কৌশলপত্র প্রণয়ন
ওয়াপসা-বিবি’র সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, খুচরা বাজারে ডিমের দাম ১০-১০.৫০ টাকা হলেও, খামার পর্যায়ে অনেক জায়গায় এটি ৭.৩০-৮.৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম। ফলে খামারিরা গড়ে প্রতিটি ডিমে ১.৬৯-২.১৯ টাকা লোকসান গুনছেন। গত ২১ দিনে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৯-২০৬ কোটি টাকা। বিপ্লব কুমার প্রামাণিক, সাধারণ সম্পাদক, ওয়াপসা-বিবি, বলেন, “বাংলাদেশের ডিম পাশের দেশের তুলনায় বেশি নিরাপদ, কারণ এখানে এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার ও মিট অ্যান্ড বোন মিল ব্যবহার নিষিদ্ধ।” ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফিআব) সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের দেশে খামার থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে ডিমের দাম ৩-৪ টাকা বাড়ে, যেখানে প্রতিবেশী দেশে এটি মাত্র ১ টাকা। তাই মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা কমাতে হবে।” ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) সাধারণ সম্পাদক শাহ ফাহাদ হাবীব জানান, শুধু ডিম নয়, একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার দামেও দরপতন হয়েছে, যা পোল্ট্রি খাতের জন্য আরও বিপজ্জনক। এদিকে, ডায়মন্ড এগসের সিইও কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান মেজবাহ বলেন, “খামারিদের ব্যাংকের বড় ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। বছরে ৩-৪ মাস লোকসানে ডিম বিক্রি করতে হয়। খামারিদের প্রতি ভয় দেখানোর পরিবর্তে উৎসাহ দিলে উৎপাদন আরও বাড়বে।” খামারিরা ডিমের ন্যায্য মূল্য চানঃ গাজীপুরের খামারি তোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ করেন, “৭.৩০ টাকায়ও ডিম বিক্রি করতে হয়েছে। সংরক্ষণ করতে গেলে জরিমানা করা হয়, অথচ সরকার খামার পর্যায়ে ডিমের মূল্য নির্ধারণ করলেও আমরা সেই দামে বিক্রি করতে পারছি না।” ডিম আমদানি নয়, রপ্তানির দাবিঃ এনিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আহকাব) সাধারণ সম্পাদক আফতাব আলম বলেন, “সরকার ডিম আমদানির অনুমতি দিলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। বরং এখন ডিম রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া উচিত।” ভবিষ্যতে চাহিদা আরও বাড়বেঃ খামারিরা বলেন, আগামী কয়েক বছরে প্রতি মাথাপিছু ডিমের চাহিদা ১৩৫ থেকে বেড়ে ৩০০ হবে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎপাদন না বাড়ালে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সরকার যদি বিপিআইসিসির ৬ দফা বাস্তবায়ন করে, তাহলে পোল্ট্রি খাত ঘুরে দাঁড়াবে এবং দেশীয় উৎপাদন টেকসই হবে বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা। |