মোঃ শফিকুর রহমান: বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত—বিশেষ করে গরু পালন—শুধু মাংস উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখে, নারীদের জীবিকা সমর্থন করে, চামড়াশিল্পকে কাঁচামাল দেয়, সার তথা জৈব সার সরবরাহের মাধ্যমে কৃষি আয়ে সহায়তা করে এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ব্রাজিল থেকে সস্তা দরে গরুর মাংস আমদানি করলে এ পুরো ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিচে আমদানির প্রধান ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করা হলো—-
- গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত: গ্রামে গরু পালন লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক ও ভূমিহীন পরিবারের নিরাপত্তার ভরসা। পরিবারের লোকেরা বাছুর লালন, ষাঁড় মোটা করা এবং কোরবানির ঈদসহ সারাবছর বাজারে বিক্রির মাধ্যমে আয় করে। হঠাৎ সস্তা আমদানিকৃত মাংস এলে স্থানীয় গরুর দাম পড়ে যাবে। দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলে কৃষকরা খাবার, চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে পারবে না। ফলে লোকসান, ঋণখেলাপি, এমনকি গরু পালন থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় ব্যবসায়ী, কসাই, খাদ্যদ্রব্য সরবরাহকারী, ভেটেরিনারি সহকারী ও হাজারো ছোট ব্যবসায়ে।
- স্বল্পমেয়াদী কম দামের ফাঁদ: ১২০ টাকা কেজি দরে ব্রাজিলের মাংস প্রথমে সস্তা মনে হলেও এটি এক ধরনের “কম দামের ফাঁদ।” স্থানীয় খামার দুর্বল হয়ে গেলে বাংলাদেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বিদেশি আমদানির ওপর। তখন বৈদেশিক বাজারের নীতি, মুদ্রামানের পরিবর্তন বা জাহাজ পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে সরবরাহ ব্যাহত হবে। স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত ঘাটতি পূরণ করা যাবে না। ফলে হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়া বা সংকট তৈরি হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য টেকসই স্থানীয় উৎপাদনভিত্তি গড়ে তোলা অপরিহার্য।
- বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়: আমদানিকৃত প্রতিটি কেজি মাংসের দাম বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। অথচ দেশে উৎপাদিত মাংসে সেই অর্থ ঘুরে ফিরে কৃষক, খাদ্যশিল্প, পরিবহন, পশুচিকিৎসা, কসাইখানা, খুচরা ব্যবসায়ী এবং চামড়াশিল্পে ব্যবহার হয়। দেশীয় বাজারে অর্থের বহুমাত্রিক প্রবাহ ঘটে। কিন্তু বিদেশি মাংস কিনলে এ মূল্য সংযোজনের সুযোগ হারাবে দেশ।
- হালাল নিশ্চয়তার জটিলতা: বাংলাদেশের ভোক্তারা কঠোরভাবে হালাল মান রক্ষা প্রত্যাশা করেন। ব্রাজিল থেকে মাংস এলে নানা প্রশ্ন উঠবে— যেমন; ক) জবাই পদ্ধতিতে হালাল মান নিশ্চিত হয়েছে কি না, খ) মিশ্র কসাইখানায় অ-হালাল মাংসের সংস্পর্শ এড়ানো গেছে কি না, গ) বিদেশি সার্টিফিকেশন কতটা বিশ্বাসযোগ্য, ঘ) দীর্ঘ শৃঙ্খল পরিবহনে হ্যান্ডলিং সঠিকভাবে হয়েছে কি না, ঙ) একটি সামান্য ত্রুটিও জনগণের আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে। দেশে স্থানীয় জবাইখানা ও নজরদারির মাধ্যমে হালাল মান অনেক সহজে রক্ষা করা যায়।
- রোগজীবাণু ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি: আমদানিকৃত মাংসের সঙ্গে নতুন ধরনের রোগজীবাণু, ওষুধের অবশিষ্টাংশ কিংবা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া আসার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সীমান্ত পেরোনো পশুরোগ যেমন এফএমডি (FMD), লাম্ফি স্কীন ডিডিজ (LSD) নিয়ে লড়ছে। নতুন জীবাণু প্রবেশ করলে বিদ্যমান পশুস্বাস্থ্য কর্মসূচি ব্যাহত হবে এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
- কোল্ড-চেইন দুর্বলতা ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি: আমদানিকৃত হিমায়িত বা ঠান্ডা মাংস অনেক ধাপে স্থানান্তর হয়—বন্দর, গুদাম, ট্রাক, খুচরা দোকান ইত্যাদি। প্রত্যেক ধাপে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ত্রুটি ঘটলে মাংসের মান নষ্ট হতে পারে। পুনরায় হিমায়ন বা সঠিক সংরক্ষণ না হলে ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দেশের বিদ্যমান কোল্ড-চেইন কাঠামো এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
- পরিবেশগত দিক থেকে ক্ষতি: ব্রাজিলের গবাদিপশু শিল্পকে প্রায়ই বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন সময় পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ যদি বিপুল পরিমাণ মাংস আমদানি করে, তবে আমরা পরোক্ষভাবে এ ধরনের ক্ষতিকর কার্যক্রমকে সমর্থন করব। অথচ দেশে পরিবেশবান্ধব ও কম নির্গমনভিত্তিক গবাদিপশু খামার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা আমাদের জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্থানীয় জাতের গবাদি পশু পালনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব খামার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব। মাননীয় উপদেষ্টা ইতিমধ্যেই লোকাল গরুর জার্মপ্লাজম উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের কাজ শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন। ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানি হলে এই কার্যক্রম মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হতে পারে।
- চামড়া, জেলাটিন ও অন্যান্য শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত: বাংলাদেশের চামড়াশিল্প দেশীয় কসাইখানা থেকে সংগৃহীত চামড়ার ওপর নির্ভরশীল। যদি স্থানীয় গরুর জবাই কমে যায়, তবে চামড়ার ঘাটতি তৈরি হবে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পকে বিপদে ফেলবে। এছাড়া হাড়, চর্বি, অন্ত্র ইত্যাদি উপজাতি থেকেও বহু ক্ষুদ্র শিল্প উপকৃত হয়। বিদেশি মাংস এলে এ খাতগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে।
- দেশীয় জাত উন্নয়নের পথে বাধা: বাংলাদেশে স্থানীয় জাতের গরুর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নানা প্রকল্প চলছে। কিন্তু বাজারে সস্তা বিদেশি মাংস এলে কৃষকরা গরু পালনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাবে। এতে দেশীয় গরুর জিনগত উন্নয়ন ও টেকসই খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা থমকে যাবে। আমাদের দেশে স্থানীয় লোকাল চাম্প্লাজন যেমন মিরকাদিম, আরসিসি, নর্থ বেঙ্গল গ্রে, পাবনা ও ব্লাক হিল নেত্রকোনা জাত উন্নয়নের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সস্তা মাংস আমদানির ফাঁদে পা দিলে লোকাল জার্মপ্লাজম উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
- বাজার অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক অশান্তি: গরুর দাম হঠাৎ কমে গেলে কৃষক ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ বা গরুর খামার বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। গ্রামীণ আয় কমে গেলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে। অন্যদিকে শহুরে ভোক্তাদের জন্য সাময়িক কম দাম দীর্ঘমেয়াদে বেশি ক্ষতি বয়ে আনবে।
- শাসন ও নিয়ন্ত্রণের বাড়তি ব্যয়: বিদেশি মাংসের হালাল নিশ্চয়তা, লেবেল, মান নিয়ন্ত্রণ, ঠান্ডা সংরক্ষণ—সবই নজরদারির দাবি রাখে। এতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ও জনবল ব্যয় হয়। অনিয়ম হলে তা জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নেবে।
বিকল্প সমাধানের পথ:
যদি লক্ষ্য হয় সাশ্রয়ী প্রোটিন সরবরাহ, তবে আমদানির বদলে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো অনেক কার্যকর—
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: উন্নত জাতের বীজ সংযোজন, কৃত্রিম প্রজনন (AI), উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, লোকাল গরুর জার্ম প্লাজম উন্নয়ন।
- খাদ্য খরচ কমানো: ঘাস চাষ, খামারভিত্তিক খাদ্য ব্যাঙ্ক, ভর্তুকি বা স্বল্পসুদে ঋণ।
- পশু স্বাস্থ্য উন্নয়ন: টিকা কর্মসূচি, পরজীবী নিয়ন্ত্রণ, ভেটেরিনারি চিকিৎসক সম্প্রসারণ।
- কসাইখানা আধুনিকীকরণ: স্বাস্থ্যসম্মত হালাল জবাই ও আধুনিক হিমায়ন।
- উপজাত পণ্যের ব্যবহার: চামড়া, হাড়, অন্ত্র প্রক্রিয়াজাতসড় রেন্ডারিং শিল্পকে শক্তিশালী করা।
- বাজার ব্যবস্থাপনা: কৃষক সমবায়, স্বচ্ছ মূল্য তথ্য, মৌসুমি মজুদ।
- সতর্ক বাণিজ্য নীতি: প্রয়োজনে সীমিত কোটা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, এবং কৃষক স্বার্থ রক্ষায় সুরক্ষা।
পরিশেষে, আমদানিকৃত সস্তা মাংস আসলে সস্তা নয়—এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান ধ্বংস, বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়, হালাল নিশ্চয়তার অনিশ্চয়তা, রোগঝুঁকি, পরিবেশগত ক্ষতি ও দেশীয় শিল্পের পতনের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ চাইলে নিজস্ব উৎপাদন উন্নত করেই জনগণকে সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও হালাল মাংস সরবরাহ করতে পারে। এ পথেই আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা সম্ভব।
লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।