মানুষের বা অন্য কোন প্রাণির জীবাণুর কারনে কোন রোগ হলে ঔষধ নির্বাচন ও প্রয়োগ বা সেবনের বিধি কি?
নিয়ম হল রোগের কারন বা জীবানু চিহ্নিত করে — নির্দিষ্ট জীবানু ধংসের জন্য নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক বয়স বা শারীরিক ওজন অনুসারে দৈনিক নির্দিষ্ট মাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেবন করাতে বা করতে হয়।
মাছ/চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে নিম্নে বর্নিত কারনে খাদ্যের সাথে বা পানিতে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ অনুচিত নয়, অপরাধ-
- এ্যাকুয়াকালচারে আন্তর্জাতিক ভাবে নিষিদ্ধ ও অনুমোদিত সকল প্রকার এন্টিবায়োটিক ব্যবহার ক্ষতিকর।
- মাছ বা চিংড়ি চাষে সাধারণত রোগের কারন বা জীবানু চিহ্নিত না করে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয় এবং জীবাণু চিহ্নিত করা অধিকাংশ চাষির পক্ষে সম্ভব নয়।
- খাদ্যের সাথে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে এর একাংশ চুইয়ে ( Leaching) পানিতে চলে যায়। এর ফলে পুকুরের পানিতে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ( Antibiotic resistant) জীবানু সৃষ্টি হয়। ইহা মানব স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি সৃষ্টি করে ও করছে। এখন অধিকাংশ রোগের চিকিৎসায় সাধারণ এন্টিবায়োটিক কাজ করে না। এর কারন পরিবেশে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু সৃষ্টি।
- বিভিন্ন আকারের মাছ ও চিংড়ি বিভিন্ন পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করে। এর ফলে বিভিন্ন আকারের মাছ ও চিংড়ি খাদ্য থেকে বিভিন্ন পরিমাণ এন্টিবায়োটিক ভক্ষণ করবে। জলজ প্রাণি কখনোই প্রতিদিন দৈহিক ওজন অনুসারে পরিমিত বা প্রয়োজনীয় পরিমাণ ঔষধ গ্রহণ করতে পারে না। এর ফলে কোন কোন প্রাণি প্রয়োজনের অতিরিক্ত এবং কোন কোন প্রাণি প্রয়োজনের চেয়ে কম এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক গ্রহণ ক্ষতিকর; আবার প্রয়োজনের কম গ্রহণ করলে প্রাণির দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জীবাণু সৃষ্টি করে। ফলে এ সকল মাছ ও চিংড়ি ভক্ষণ মানুষের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। তাছাড়া, প্রয়োজনের চেয়ে কম এন্টিবায়োটিক সেবনের ফলে চিংড়ি বা মাছের রোগ নিরসন না হয়ে তা আরো তীব্র ও ক্ষতিকর হবে।
- এন্টিবায়োটিক সেবনের বিধি অনুসারে রোগজীবাণু ধংসের জন্য ঔষধটি প্রতিদিন নির্দিষ্ট মাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেবন করতে হয়। এটা নিশ্চিত জলজ প্রাণিকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট মাত্রায় ৩, ৫ বা ৭ দিন খাওয়ানো কখনো সম্ভব নয়। তাই, পানিতে বা খাদ্যে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের করে মাছের বা চিংড়ির রোগ চিকিৎসা করা কঠিন। বরং এর ফলে সাধারণত জীবাণু ধংস না হয়ে শক্তিশালী হয়ে রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি করে, মাছ ও পরিবেশে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু সৃষ্টি করে এবং মাছ বা চিংড়ি মানুষ কতৃক ভক্ষণের জন্য অনিরাপদ হয়ে যায় ও পরিবেশে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু সৃষ্টি করে মানুষের ক্ষতি সাধিত করে।
এ্যাকুয়াকালচার ও পশুপালনে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে WHO, USFDA, EU/ FVO, European Commission, World Organisation for Animal Health ( OIE) ইত্যাদির কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে । মৎস্য অধিদপ্তরেও এ বিষয়ে একটি আইন রয়েছে।
মাছ ও চিংড়ির রোগ সংক্রমণ না হওয়ার বিষয়ে ও সংক্রমণ দেখা দিলে করণীয় –
- পুকুরের পানি নিষ্কাশন করে তলদেশের আবর্জনা অপসারণ ও তলদেশ জীবাণু মুক্ত করন।
- পুকুরে উত্তম মানের পানি প্রবেশ করানো। সম্ভব হলে প্রবেশ করানো পানি জীবানু মুক্ত করন।
- সুস্থ-সবল পোনা মজুদ করা।
- চাষের সর্বসময়ে জীবানু মুক্ত খাদ্য, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি এবং রোগ না হওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
- পানির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেলে সম্ভব হলে পানি বদল করা।
- অধিক ঘনত্বে চাষ করলে এ্যায়ারেটর ব্যবহার করা।
- রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে নিয়মিত উত্তম মানের প্রোবায়োটিকস প্রয়োগ করা যেতে পারে।
- রোগ দেখা দিলে প্রয়োজনে পুকুরে জীবানু নাশক প্রয়োগ করে পানি জীবানু মুক্ত করতে হবে। তবে জীবাণু নাশক ব্যবহার করা পুকুরে জীবাণু নাশকের সক্রিয়তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ( ১০-১২ দিন বা জীবানু নাশক উৎপাদন বা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুসারে) প্রোবায়োটিকস প্রয়োগ করা যাবে না।
কতিপয় অনুমোদিত জীবানুনাশকঃ বি. কে. সি, ক্লোরিন ( ক্যালসিয়াম বা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড বা ব্লিচিং), পবিডন আয়োডিন, কিউট্রিন প্লাস, ফরমালিন, হালামিড ইত্যাদি। এই জীবানু নাশকগুলো বাজারে বিভিন্ন নামে বিক্রি হয়।
উল্লেখ্য যে জীবাণু নাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রে জীবাণু নাশকের সক্রিয় উপাদান( জীবাণু নাশকটির %) অনুসারে প্রয়োগের পরিমাণ পি.পি.এম হারে হিসাব করে প্রয়োগ করতে হবে। একর বা শতাংশ হিসেবে প্রয়োগ করলে কার্যকরী ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারন একেক পুকুরের গভীরতা একেক রকম থাকে। ফলে ৫ ফুট গভীরতার শতাংশ, ৬ ফুট গভীরতা শতাংশ, ৪ ফুট গভীরতার শতাংশ ইত্যাদিতে একই পরিমাণ পানি থাকবে না। ঔষধ বা রাসায়নিক প্রয়োগ করতে হয় পানির পরিমাণের হিসেব করে।
** পি. পি. এম= পুকুরের বা চৌবাচ্চার পানির দৈর্ঘ্য(মি:) xপ্রস্থ (মি:) xগভীরতা (মি:)x জীবানু নাশক প্রয়োগের পি. পি. এম. = মোট জীবাণু নাশক প্রয়োগের পরিমান( মিঃলি:বা গ্রাম)।
–লেখকঃ এম কবির আহমেদ, সাবেক পরামর্শক, হালদা ফিশারিজ লিমিটেড এবং সাবেক সহকারি পরিচালক, শ্রিম্প হ্যাচারি, কক্স বাজার, ডিপার্টমেন্ট অফ ফিশারিজ। |