সফল মাছচাষি মোঃ মোস্তফা কামালের গল্প: মৎস্য খাতে সম্ভাবনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

ভূমিকা: মৎস্য খাত বাংলাদেশের অর্থনীতি, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত। দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এই খাতটির অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ খাতের বিকাশে সরকার ও মৎস্য অধিদপ্তরের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ দৃশ্যমান সাফল্য এনেছে। এই খাতের সম্ভাবনাকে বাস্তবতায় রূপ দিয়ে অনেকেই আজ সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তেমনই একজন সফল মৎস্যচাষি হলেন গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার হাইলজোড় গ্রামের মোঃ মোস্তফা কামাল।

ব্যক্তিগত পটভূমি: মোঃ মোস্তফা কামাল একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মফিজ উদ্দিন সন্তানদের শিক্ষিত করতে চাইলেও অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণে মোস্তফা কামালের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি হতাশ না হয়ে জীবনের অন্য একটি সম্ভাবনাময় পথে হাঁটেন—মৎস্যচাষ।

মৎস্যচাষে যাত্রা শুরু: ১৯৯২ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে অকৃতকার্য হওয়ার পর ড্যানিডা প্রকল্পের পরামর্শে তিনি ৫০ শতক জমি লিজ নিয়ে মাছচাষ শুরু করেন। এরপর ১৯৯৪ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৩ মাসব্যাপী মৎস্যচাষ প্রশিক্ষণ নিয়ে এ খাতে তার দক্ষতা বৃদ্ধি করেন। উপজেলা মৎস্য অফিস ও ড্যানিডা প্রকল্পের সহায়তায় তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ শুরু করেন।

সাফল্যের চিত্র: বর্তমানে তাঁর খামারের আয়তন ৩.৫০ হেক্টর এবং পুকুরের সংখ্যা ৬টি। খামারে কার্প, পাবদা, গুলশা ও শিং মাছের চাষ করে তিনি বছরে প্রায় ২৫.১৫ মে.টন মাছ উৎপাদন করেন। এর থেকে তার নিট লাভ হয় প্রায় ৫.১৮ লক্ষ টাকা। বর্তমানে তাঁর খামারে বিনিয়োগ রয়েছে ২৫ লক্ষ টাকা এবং কর্মসংস্থান হয়েছে ৫ জন বেকার যুবকের। ১০টি পরিবার পরোক্ষভাবে এই খামারের সুফল পাচ্ছে।

প্রশিক্ষণ ও অবদান: মোস্তফা কামাল এনএটিপি প্রকল্পের একজন লিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় চাষিদের মাছচাষে উৎসাহিত করছেন ও পরামর্শ প্রদান করছেন। উন্নত পোনা ও খাদ্য ব্যবহার, পানির গুণাগুণ রক্ষা এবং আধুনিক সরঞ্জাম (যেমন অ্যারেটর) ব্যবহার করে তিনি আধুনিক মাছচাষে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

সমাজে প্রভাব ও অনুপ্রেরণা: মোস্তফা কামালের এই সাফল্য স্থানীয় জনগণের মধ্যে মাছচাষে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেক বেকার যুবক তার অনুপ্রেরণায় মাছচাষে যুক্ত হয়ে স্বনির্ভরতা অর্জন করছেন। তিনি শুধুমাত্র একজন সফল উদ্যোক্তা নন, বরং একজন সামাজিক অনুপ্রেরণার উৎসও বটে।

মৎস্যচাষি মোঃ মোস্তফা কামালের এই সাফল্য প্রমাণ করে যে, যথাযথ পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ থাকলে যেকোনো ব্যক্তি নিজেকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। জাতীয় পর্যায়ে মৎস্য খাতের অগ্রগতিতে তাঁর অবদান প্রশংসনীয় এবং দেশের অন্যান্য যুবকদের জন্য অনুকরণীয়। এই ধরনের সাফল্যগাঁথা কাহিনী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।