| নতুন বছরের আলো যখন গ্রামবাংলার উঠোনে পড়ে, তখন আশার মধ্যে একটু উৎকণ্ঠাও জাগে, এই বছর কি একটু ভালো যাবে? ধানের দাম কি বাড়বে; মাছের বাজার কি স্থিতিশীল হবে; খামারের দুধ-ডিম কি ন্যায্য দামে বিক্রি হবে? এসব প্রশ্নের মাঝেই এ বছর আসছে ‘কৃষক কার্ড’। আগামী পহেলা বৈশাখ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের কৃষকদের জন্য এই কার্ডের কার্যক্রম উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরের স্রোতটি বুঝতে হলে গ্রামে তাকাতে হয়। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ– এই তিন খাতই আমাদের খাদ্য, পুষ্টি এবং জীবিকার ভিত্তি। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩-১৪ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বে শীর্ষ দেশগুলোর একটি। এখানে প্রতিবছর ৪.৯ মিলিয়ন টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ খাতও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশে বছরে ৯-১০ বিলিয়ন ডিম উৎপাদিত হয়। দুধ উৎপাদন হয় ১৩-১৪ মিলিয়ন টন এবং মাংস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই তিন খাত মিলেই বাংলাদেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড গড়ে তুলেছে। তবুও নীতিগত বাস্তবতায় আমরা এখনও খাতগুলোকে আলাদা সেক্টর হিসেবে দেখি, যা বড় কাঠামোগত দুর্বলতা। মাঠে ফসল হচ্ছে, ঘেরে মাছ হচ্ছে, খামারে দুধ-ডিম বাড়ছে; তবুও কৃষক, মাছচাষি কিংবা খামারি অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। উৎপাদনের পর সঠিক সংরক্ষণ ও পরিবহনের অভাবে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব এখনও প্রবল। সরকারি সহায়তা থাকলেও তা সবসময় প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে না। তথ্যের অভাবে কৃষকের সিদ্ধান্ত অনেক সময় অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে; বিজ্ঞানের ওপর নয়।প্রশ্ন হলো, এই বিশাল উৎপাদন কাঠামোর মূল চালিকাশক্তি, অর্থাৎ কৃষক, মাছচাষি ও খামারিদের একীভূত সেবা ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারবে ‘কৃষক কার্ড’? প্রথমত, কৃষক কার্ডকে কেবল ফসল উৎপাদনকারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে বড় নীতিগত সীমাবদ্ধতা। এটি বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গ্রামীণ উৎপাদক প্রায়ই একমঙ্গে কৃষক, মাছচাষি এবং পশুপালক– তাদের কার্যক্রম আন্তঃসম্পর্কিত। তাই একটি খাতভিত্তিক কার্ডের পরিবর্তে সমন্বিত ‘ন্যাশনাল প্রডিউসার কার্ড’ চালু করা জরুরি, যেখানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ; তিনটি খাতই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
দ্বিতীয়ত, এ কার্ডকে শুধু ভর্তুকি বা প্রণোদনা বিতরণের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে এটি প্রশাসনিক টুল হিসেবেই থেকে যাবে। একে বরং ‘স্মার্ট সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম’-এ রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি কার্ডধারীর ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে জমির পরিমাণ, পুকুরের তথ্য, গবাদি পশুর সংখ্যা, উৎপাদনের ধরন, রোগঝুঁকি এবং আর্থিক অবস্থা সংরক্ষিত থাকবে। এই ডেটা ব্যবহার করে কৃষিঋণ, প্রাণিসম্পদ ঋণ, বীমা ও বিনিয়োগ আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর করা সম্ভব। তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থায় বিদ্যমান অদক্ষতা দূর করতে কৃষক কার্ডকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে কৃষক, মাছচাষি ও খামারিরা উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নেয়, কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য পায় না। মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর ব্যবস্থায় তারা প্রায়ই বঞ্চিত হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় ব্যবস্থা ও ডিজিটাল মার্কেট লিংকেজ তৈরি করা গেলে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন সম্ভব হবে। এতে যেমন উৎপাদক লাভবান হবে, তেমনি ভোক্তার জন্যও নিরাপদ ও সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত হবে। চতুর্থত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে উৎপাদন খাতের সংযোগ তৈরি করা যেতে পারে। পরিবারভিত্তিক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে স্থানীয় কৃষক, মাছচাষি ও খামারির পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা গেলে টেকসই ‘লোকাল ফুড সিস্টেম’ গড়ে উঠবে। এতে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত হবে, অপচয় কমবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। পঞ্চমত, কৃষক কার্ড শক্তিশালী ‘ডেটা প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করতে পারে। বর্তমানে কোথায় কী উৎপাদন হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত– এর নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। একটি রিয়েল-টাইম ডেটাবেজ থাকলে নীতিনির্ধারণ আরও বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর হবে। খাদ্য আমদানি-রপ্তানি, মূল্য স্থিতিশীলতা এবং সংকট ব্যবস্থাপনায় এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বয়ের অভাব। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত আলাদা ডেটাবেজ ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে পরিচালিত হলে কৃষক কার্ড কখনোই পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাবে না। একটি একীভূত, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা জরুরি। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোও অপরিহার্য। দেশের অনেক কৃষক, মাছচাষি ও খামারি এখনও ডিজিটাল ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নয়। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সহায়তা কেন্দ্র এবং সহজ ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। স্বীকার করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে অনেক ভালো উদ্যোগ কেবল আংশিক বাস্তবায়নের কারণে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। কৃষক কার্ডও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়। এটি যদি কেবল পরিচয়পত্র বা ভর্তুকি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবেই থেকে যাবে। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি যুগান্তকারী উদ্যোগে পরিণত হতে পারে, যা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে একত্র করে আধুনিক, ডেটা-চালিত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎপাদন ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তুলবে। লেখকঃ ড. মো. শরীফুল ইসলাম: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (ফিশারিজ), সার্ক কৃষি কেন্দ্র, ঢাকা। ইমেইলঃ bausharif@gmail.com |








