চিংড়ি খাতে ২,০০০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন: প্রান্তিক চাষিদের জন্য ৭০% বরাদ্দ ও নীতিনির্ধারণে FOAB-এর অন্তর্ভুক্তির দাবি

বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ২,০০০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়েছে Fish Farm Owners Association Bangladesh (FOAB)। তবে সংগঠনটির দাবি, এই অর্থায়নের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ যেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চিংড়ি চাষিদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং পুরো কর্মসূচির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ে FOAB-কে সহযোগী স্টেকহোল্ডার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। FOAB-এর নেতারা মনে করেন, প্রকৃত উৎপাদকদের কাছে অর্থায়ন পৌঁছাতে না পারলে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য—উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি—অর্জন করা কঠিন হবে।

উৎপাদনের ভিত্তি প্রান্তিক চাষিঃ বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২.৭ থেকে ২.৮ লাখ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। এ খাতে সরাসরি প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি যুক্ত রয়েছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এই শিল্পকে ঘিরে। এ ছাড়া দেশে প্রায় ৭০টি রপ্তানিযোগ্য প্রসেসিং কারখানা, ৬০-৭০টি সামুদ্রিক ও ৮০-১০০টি স্বাদুপানির হ্যাচারি এবং শতাধিক ফিড, ওষুধ, ডিপো, বরফকল ও পরিবহন প্রতিষ্ঠান এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংড়ি শিল্প কেবল একটি রপ্তানি খাত নয়; এটি উপকূলীয় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

সক্ষমতা থাকলেও কাঁচামালের সংকটঃ গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন হিমায়িত মাছ ও মৎস্যপণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার মেট্রিক টন ছিল চিংড়ি ও সংশ্লিষ্ট পণ্য। অন্যদিকে দেশের ফ্রোজেন ফুড শিল্পের বিদ্যমান প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ শিল্পের বড় একটি অংশ এখনও অব্যবহৃত রয়েছে। FOAB-এর মতে, এর প্রধান কারণ প্রসেসিং সক্ষমতার অভাব নয়; বরং পর্যাপ্ত কাঁচামাল উৎপাদন না হওয়া।

কেন চাষিদের হাতে পৌঁছাতে হবে অর্থ?সংগঠনটির দাবি, দেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চিংড়ি চাষি এখনও ব্যাংক ঋণের বাইরে রয়েছেন। ফলে তারা উচ্চ সুদের এনজিও ঋণ, মহাজনি, ফড়িয়া কিংবা ডিপো মালিকদের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে অনেকেই উন্নতমানের SPF পোনা, মানসম্মত খাদ্য, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা কার্যকর রোগ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে পারেন না। FOAB-এর মতে, উৎপাদন বাড়াতে হলে অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে প্রকৃত উৎপাদকদের।

FOAB-কে কেন যুক্ত করার দাবি?সংগঠনটির ভাষ্য, বাংলাদেশে চিংড়ি খাতের জাতীয় পর্যায়ের উৎপাদকভিত্তিক সংগঠন হিসেবে FOAB মাঠপর্যায়ে চাষি, ঘের মালিক ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। সংগঠনটি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত প্রস্তাব জমা দিয়েছে এবং অর্থ, বাণিজ্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অনুলিপি পাঠিয়েছে। FOAB-এর মতে, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

FOAB যে দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দিয়েছেঃ সংগঠনটির মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগী হিসেবে তারা—

  • প্রকৃত চাষি শনাক্তকরণ
  • আবেদন যাচাই
  • সদস্যভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি
  • মাঠপর্যায়ে তদারকি
  • উৎপাদন মনিটরিং
  • প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ
  • অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ
  • জালিয়াতি প্রতিরোধ

—এসব দায়িত্ব পালন করতে পারে।

অর্থায়নের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

FOAB-এর প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থায়নের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হতে পারে—

  • স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ
  • SPF ও রোগমুক্ত পোনা উৎপাদন
  • মানসম্মত ফিড ব্যবহার
  • রোগ শনাক্তকরণ ও ল্যাব সুবিধা
  • আধুনিক প্রযুক্তি ও বায়োসিকিউরিটি
  • হ্যাচারি উন্নয়ন
  • ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা
  • কোল্ড চেইন অবকাঠামো
  • ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উৎপাদন
  • নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাঃ FOAB-এর মতে, অতীতে বিভিন্ন অর্থায়ন কর্মসূচিতে প্রকৃত উৎপাদকদের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে কাগুজে উদ্যোক্তারা সুবিধা পেয়েছেন। ফলে প্রত্যাশিত উৎপাদন বৃদ্ধি হয়নি এবং অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। সংগঠনটির দাবি, এবার যেন সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি না হয়।

FOAB সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহীন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের ২,০০০ কোটি টাকার এই উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এর মূল লক্ষ্য হতে হবে উৎপাদন বৃদ্ধি। আর উৎপাদন বাড়াতে হলে অর্থ অবশ্যই প্রকৃত চিংড়ি চাষির হাতে পৌঁছাতে হবে। তাই আমরা কমপক্ষে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি।”

FOAB-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি অর্থনীতিবিদ সাকিফ শামীম বলেন, “চিংড়ি খাতের অর্থায়নকে শুধু ঋণ কর্মসূচি হিসেবে নয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। স্বচ্ছতা, ডিজিটাল মনিটরিং ও মাঠভিত্তিক যাচাই নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে বহুগুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

FOAB-এর কার্যনির্বাহী সদস্য ড. বায়েজিদ মোড়ল বলেন, “বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রান্তিক উৎপাদক। অথচ অধিকাংশ চাষি এখনও ব্যাংক ঋণের বাইরে। তাই অর্থায়নের কেন্দ্রবিন্দুতে প্রকৃত চাষিকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্য, প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন মনিটরিংয়ে FOAB-কে সম্পৃক্ত করলে প্রকল্পের সফলতা অনেকগুণ বাড়বে।”

কক্সবাজার আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মাওলানা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাই এ প্রকল্পে তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”

সরকারের প্রতি আহ্বান

FOAB সরকারের প্রতি পাঁচটি সুপারিশ করেছে—

  • প্রকৃত উৎপাদককে অগ্রাধিকার দেওয়া।
  • মোট অর্থায়নের অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য সংরক্ষণ।
  • নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে FOAB-কে সহযোগী স্টেকহোল্ডার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
  • স্বচ্ছ ও ডিজিটাল জবাবদিহিমূলক অর্থ বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
  • উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ করা।

FOAB মনে করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ২,০০০ কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি যদি প্রকৃত উৎপাদককেন্দ্রিক নীতিতে বাস্তবায়িত হয় এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করা হয়, তবে এটি বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং উপকূলীয় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হবে।