পোল্ট্রি খাতে প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করলে সংকটের আশঙ্কা: BPIA

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (BPIA) পোল্ট্রি খাতের ভবিষ্যৎ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে যে, প্যারেন্ট স্টক (PS) বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সিদ্ধান্ত দেশের ডিম ও মুরগির বাজারে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যা উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করার ঝুঁকি তৈরি করবে। BPIA-এর সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী ও মহাসচিব এম. সাফির রহমান স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

উল্লেখিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত তথ্য নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশন (BPIA) গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে যে, পোল্ট্রি খাতের প্যারেন্ট স্টক (পি এস) বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবনা যথাযথ প্রস্তুতি ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া বাস্তবায়ন করা হলে তা সরাসরি ডিম ও মুরগির মাংসের ভোক্তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। উল্লেখ্য, পোল্ট্রি খাত শুধু একটি শিল্প নয়-এটি দেশের প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস, গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং লাখো মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি।

বর্তমান কাঠামোয় পি এস (প্যারেন্ট স্টক) বাচ্চা আমদানি সীমিত বা নিয়ন্ত্রিত হলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে হাতে গোনা কয়েকটি বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠান, যারা একই সঙ্গে জিপি (গ্র্যান্ড প্যারেন্ট), পি এস (প্যারেন্ট স্টক), কমার্শিয়াল লেয়ার ও ব্রয়লার বাচ্চা, ফিড উৎপাদন এবং কন্ট্রাক্ট গ্রোয়িং ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর ফলে এই করপোরেট গোষ্ঠীর বাইরে থাকা অধিকাংশ হ্যাচারি ও ব্রিডার ফার্ম-যারা মূলত একদিন বয়সী লেয়ার ও ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদন করেন-পি এস বাচ্চা পাওয়ার সুযোগ থেকে কার্যত বঞ্চিত হবেন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা নষ্ট হয়ে একটি অলিগোপলি কাঠামো তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রস্তাবিত পোল্ট্রি নীতিমালা ২০২৬-এর মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে।

BPIA মনে করে, এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান প্রথমে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করবে এবং পরবর্তীতে অবশিষ্ট পি এস বাচ্চা অত্যন্ত চড়া দামে বাজারে ছাড়বে। উৎপাদন কৌশলগতভাবে সীমিত রেখে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হলে প্রান্তিক ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অনেক খামার বাচ্চা সংকটে বন্ধ হয়ে যাবে, উৎপাদন কমে আসবে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে যেখানে ভোক্তাদের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে বাধ্য হতে হবে।

এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও হবে সুদূরপ্রসারী। পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে, গ্রামাঞ্চলে আয় ও অর্থপ্রবাহ কমবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-উৎস পর্যায়ে যদি সরবরাহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়, তাহলে সরকারের পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য স্থিতিশীল রাখা কিংবা ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। এতে সরকার খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় বহুমুখী চাপে পড়বে।

BPIA দৃঢ়ভাবে মনে করে, পি এস বাচ্চা আমদানিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বা অতি-কঠোর নিয়ন্ত্রণ কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং আমদানিকে উন্মুক্ত ও নমনীয় রাখা জরুরি, যাতে সংকটকালে দ্রুত পি এস বাচ্চা বা হ্যাচিং ডিম আমদানি করা সম্ভব হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান পশু রোগ নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ডিম ও মুরগি আমদানি সংক্রান্ত নীতিমালায় সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। প্রয়োজন হলো-এসব আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

পোল্ট্রি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা, বহুমুখী সরবরাহ উৎস উন্মুক্ত রাখা এবং প্রান্তিক ও মাঝারি খামারির সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকারি নীতিনির্ধারণে যদি কোনো গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পায়, তবে তার মাশুল দিতে হবে ভোক্তা, খামারি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে-যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই BPIA সংশ্লিষ্ট সকল নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, পি এস (প্যারেন্ট স্টক) বাচ্চা আমদানির বিষয়ে বাস্তবসম্মত, ভোক্তা-স্বার্থবান্ধব এবং বাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকারী নীতি গ্রহণ করার। অন্যথায়, প্রস্তাবিত “পোল্ট্রি নীতিমালা ২০২৬”-এর এই সিদ্ধান্ত ডিম ও মুরগির ভোক্তাদের জন্য এক গভীর ফাঁদে পরিণত হতে পারে।

BPIA মনে করিয়ে দিয়েছে যে, পি এস বাচ্চা আমদানি বন্ধ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং, দেশে উন্মুক্ত ও নমনীয় আমদানি নীতি বজায় রাখা জরুরি, যাতে সংকটকালেও দ্রুত পি এস বাচ্চা বা হ্যাচিং ডিম আমদানি করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে, দেশীয় পশু রোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ও আমদানিসংক্রান্ত নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। BPIA-এর অভিমত, পোল্ট্রি খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা, বহুমুখী সরবরাহ উৎস এবং প্রান্তিক ও মাঝারি খামারিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অন্যথায়, প্রস্তাবিত “পোল্ট্রি নীতিমালা ২০২৬” বাস্তবায়নের ফলে ডিম ও মুরগির বাজারে ভোক্তাদের জন্য গভীর সংকট তৈরি হতে পারে।