পোল্ট্রি শিল্পকে টেকসই করতে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি

প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন দেশের তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারীরা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের পোল্ট্রি খামারিরা টিকে থাকবে না, সব ঝরে পড়বে। এতে পুরো পোল্ট্রি খাত চলে যাবে বাণিজ্যিক কিছু প্রতিষ্ঠানের অধীনে। এর ফলে সহজলভ্য প্রোটিনের বড় উৎস ডিম কিনে খেতে হবে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ দামে। কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ। তাই পোল্ট্রি শিল্পকে টেকসই করতে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা, ফিড ও ভ্যাকসিনে ভর্তুকি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। শনিবার (১১ জুলাই) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর আহমেদ চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে পোল্ট্রি খামারিদের ডিজিটাল ডাটাবেজ চালুর দাবি জানানো হয়। এর আগে সারাদেশের পোল্ট্রি খামারিদের রক্ষার ১১ দফা দাবি নিয়ে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন খামারিরা। এ সময় তারা সিদ্ধ ডিম বিতরণ করে প্রতিবাদ জানান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিপিআইএ এর সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশের হাজার হাজার ডিম উৎপাদনকারী খামারি দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিদিন তারা লোকসান গুনছেন।  ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিচ্ছেন- এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ডিম উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পোল্ট্রি খাতে যৌক্তিক মূল্য (ফেয়ার প্রাইস) নির্ধারণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বিবেচনা করে এমন একটি মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যাতে খামারিরা অন্তত ন্যায্য মুনাফা পান এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারেন।

সারা দেশের পোল্ট্রি খামারিদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির আহ্বান জানিয়ে বিপিআইএ সভাপতি বলেন, সারা দেশের খামারিদের একটি জাতীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু হলে প্রকৃত খামারিদের সহজে শনাক্ত করা যাবে এবং খামারিদের ঝরে পড়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি বাস্তব সময়ে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও স্বল্পসুদে ঋণ সরাসরি প্রকৃত খামারিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। মোশারফ হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, দেশে মাছ, মুরগির বাচ্চা, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদন উপকরণের দাম বেড়েছে। তবে সেই অনুপাতে খামার পর্যায়ে ডিমের দাম সমন্বয় করা হয়নি। ফলে পোলট্রি–শিল্পের মূল চালিকা শক্তি প্রান্তিক খামারিরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন। গত ৫ বছরে ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বিপিআইএ এর মহাসচিব এম সাফির রহমান বলেন, খামারিদের ৭০-৮০ শতাংশ ব্যয় চলে যায় খাদ্যের পেছনে। তার সঙ্গে খাদ্যের উপকরণ আমদানিতে আছে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর; আমরা এটা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছি।’ প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৃষিখাতের কাঁচামালে এমন কর ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ের অভাবে পোল্ট্রি খাতে সুফল পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে জাতীয় পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করা হোক। উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে আগামী এক দশকে পোল্ট্রি খাত সফল শিল্প খাতে পরিণত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, যখন খামারিরা লোকসান দিয়ে সাড়ে চার টাকায় ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হন, তখনও ভোক্তাকে সাড়ে দশ টাকায় ডিম কিনতে হয়। ডিম পচনশীল পণ্য হওয়ায় খামারিরা তা মজুত করতে পারেন না, আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

নিবন্ধিত খামারিদের জন্য Farmer ID চালু করুন। প্রান্তিক খামারিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, ও পোল্ট্রি বীমা চালু, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য পোল্ট্রি খামারঘন অঞ্চলে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও খামারি সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী পোল্ট্রি শিল্প কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম বা বাংলাদেশ জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠনসহ নানা দাবি তুলে ধরেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিপিআইএ-এর উপদেষ্টা এন. সি. বণিক, কামাল আহমেদ, সহ-সভাপতি মো: আসাদুজ্জামান (মেজবা), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, প্রচার সম্পাদক ড. শফিকুর রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক গাজী নূর হোসেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন মুন্সী এছাড়া মূল কমিটিতে আছেন: মো: সৈয়দুল হক খান (সহ-সভাপতি), মোস্তফা জাহান (ট্রেজারার), শাহ ফাহাদ হাবিব (কার্যনির্বাহী সদস্য), মিজানুর রহমান মিন্টু (কার্যনির্বাহী সদস্য), রাশিদ আহামাদ (কার্যনির্বাহী সদস্য), মোহাম্মদ জহির উদ্দিন (কার্যনির্বাহী সদস্য), খায়রুল বাসার সাগর (কার্যনির্বাহী সদস্য), ফয়েজ রাজা চৌধুরী (কার্যনির্বাহী সদস্য), মো: সোলেমান কবীর (কার্যনির্বাহী সদস্য), মো: ইমরান হোসাইন (কার্যনির্বাহী সদস্য), নাবিল আহামেদ (কার্যনির্বাহী সদস্য)।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত খামারিরা তাদের বাস্তব সংকট তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন, সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষতিপূরণ, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সারাদেশের পোল্ট্রি খামারিদের ডিজিটাল ডাটাবেজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন জানান।