পোল্ট্রি সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কামাল আহম্মদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

আজ ৫ জানুয়ারি ২০২৬ দেশের পোল্ট্রি সাংবাদিকতার পথিকৃৎ, পোলট্রি খামার বিচিত্রা-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কামাল আহম্মদ-এর মৃত্যুবার্ষিকীর দ্বিতীয় বছর। ২০২৪ সালের এই দিনে সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে তিনি রাজধানীর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, সহকর্মী, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে তথ্যপ্রবাহের দিকনির্দেশক হিসেবে কামাল আহম্মদ ছিলেন এক অনন্য নাম। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে পোল্ট্রি খাতভিত্তিক গণমাধ্যমের তীব্র সংকটের সময় তিনি সাহসিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নেন একটি বিশেষায়িত পত্রিকা প্রকাশের। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে প্রস্তুতিমূলক সংখ্যা প্রকাশের পর ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে থাকে মাসিক ম্যাগাজিন পোলট্রি খামার বিচিত্রা। দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পত্রিকাটি ৩৪ বছরে পদার্পণ করে, যা দেশের কৃষি ও পোল্ট্রি সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

www.feednewsbd.com এর সম্পাদক মো. আল-আমিনের সাংবাদিকতা জীবনে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবময় অধ্যায় ছিল প্রায় আট বছর ধরে পোল্ট্রি খামার বিচিত্রা-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত কামাল আহাম্মদের সান্নিধ্যে কাজ করার সুযোগ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কামাল আহাম্মদ ছিলেন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নীতিবোধে সমৃদ্ধ এক উজ্জ্বল সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব। তার কাছ থেকে অর্জিত পেশাগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি মো. আল-আমিনের সাংবাদিকতা চর্চাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সেই সময়কার শিক্ষা ও প্রেরণাই আজ তার নতুন উদ্যোগের শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে এবং এগিয়ে চলার সাহস জোগাচ্ছে।

পোলট্রি খামার বিচিত্রা-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে কামাল আহম্মদ ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (WPSA-BB) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রথম সদস্য ছিলেন এবং টানা ২৬ বছর এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত নির্বাহী কমিটির নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালে বার্ডফ্লু নিয়ে সৃষ্ট গুজব প্রতিরোধে WPSA-BB-এর সঙ্গে যৌথভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজনেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পোল্ট্রি সাংবাদিকতাকে পরিচিত করাতেও কামাল আহম্মদের অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০০৪ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত VIV ASIA প্রদর্শনীর জার্নালিস্ট প্রোগ্রামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪৭ জন সাংবাদিকের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে তিনি থাইল্যান্ডের সিপি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অ্যাডিরেক শ্রিপ্রতাকের সঙ্গে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের পোল্ট্রি শিল্প নিয়ে মতবিনিময় করেন। একইভাবে ২০১৫ সালে VICTAM ASIA প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রিত হন তিনি, যা পোলট্রি খামার বিচিত্রাকে এশিয়ার কৃষিভিত্তিক গণমাধ্যমের একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।

শিক্ষাজীবনে কামাল আহম্মদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অধীনে এমফিল গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। তিনি আজীবন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট মেম্বার হিসেবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পেশাগত কারণে তিনি ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন এবং দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা পেশাজীবীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তা পোলট্রি খামার বিচিত্রায় প্রকাশ করেন।

দেশের কৃষি সাংবাদিকতা ও পোল্ট্রি খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ WPSA-BB ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল আয়োজিত আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি এক্সপোতে তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ লাইভস্টক সোসাইটি কর্তৃক তিনি লাইভস্টক অ্যাওয়ার্ড ২০২২ লাভ করেন।

একজন আধুনিক চিন্তার সাহসী উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিত কামাল আহম্মদ মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন দুরারোগ্য মোটর নিউরন ডিজিজে ভুগছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি রাজশাহীতে একটানা চিকিৎসা নেন। জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। তার মৃত্যু বাংলাদেশের পোল্ট্রি সাংবাদিকতা ও কৃষি গণমাধ্যমে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা আজও সহকর্মী ও পাঠকদের হৃদয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়।

www.feednewsbd.com পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়াত কামাল আহাম্মদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে আন্তরিক দোয়া করা হচ্ছে। আমরা চাই, আল্লাহ যেন তাকে ক্ষমা করে দেন, তার কবরকে নূরে ভরপুর করেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহীদের এই গভীর শোক সইবার শক্তি ও ধৈর্য দান করুন—এই দোয়াই রইল।