| দেশের ফিড ও পোল্ট্রি শিল্প আজ এক নীরব কিন্তু ভয়ংকর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটভিত্তিক ব্যবস্থা, যার নিয়ন্ত্রণ মূলত কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের ক্রয় বিভাগের হাতে। এই বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা আজ এমন অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেন তারা চাইলে একেকটি ফিড মিলকে ব্যবসা দিতে পারেন, আবার চাইলে ধীরে ধীরে সেটিকে বাজার থেকে ছিটকে ফেলতেও পারেন।
বাহ্যিক জীবনে এই কর্মকর্তাদের অনেকেই ধর্মপরায়ণ ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। নামাজ পড়েন, হজ করেন, যাকাত দেন, দান-খয়রাত করেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে তারা ‘ভদ্রলোক’ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এই সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য মুখোশের আড়ালে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য, অথচ ভয়ংকর শক্তিশালী স্বার্থচক্র। নিজেদের অবস্থান, প্রভাব এবং সুবিধা টিকিয়ে রাখতে তারা তৈরি করেছে সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঘুষ ও কমিশননির্ভর বাণিজ্য। কাগজে-কলমে সবকিছু নিয়মের মধ্যেই থাকে—টেন্ডার, কোটেশন, অনুমোদন, চুক্তি সবই হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় টেবিলের নিচের লেনদেনের ভিত্তিতে। কোটি কোটি টাকার এই অদৃশ্য বাণিজ্যই ধীরে ধীরে কিছু কর্মকর্তাকে পরিণত করছে অস্বাভাবিক রকমের ধনীর কাতারে। শোনা যায়, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে “মিটিং” ও “বাণিজ্যিক সফর”-এর নামে যাতায়াত হয় নিয়মিত। কাগজে এসব সফরকে দেখানো হয় দক্ষতা বৃদ্ধি বা আন্তর্জাতিক বাজার পরিদর্শন হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেখানে হয় অলিখিত সমঝোতা, অলিখিত চুক্তি আর ভবিষ্যৎ কমিশন বাণিজ্যের রূপরেখা তৈরি। বাইরে থেকে সবকিছু বৈধ ও ঝকঝকে, ভেতরে ভেতরে চলে স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন ফিড মিলের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও মালিকরা। যারা তিলে তিলে কষ্ট করে, বছরের পর বছর শ্রম, মেধা আর অর্থ ঢেলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ ব্যবসার সব সঞ্চয় ঢেলে, কেউ আবার আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে ফিড মিল গড়ে তোলেন। একটি পর্যায়ে এসে ব্যবসা সম্প্রসারণ বা টিকে থাকার জন্য ব্যাংক ঋণের আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু সিন্ডিকেটনির্ভর এই বাজারব্যবস্থায় তারা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ন্যায্য দামে কাঁচামাল পাওয়া কঠিন হয়ে যায়, বড় ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের সুযোগ সংকুচিত হয়। অনেক সময় দেখা যায়, গুণগত মান ঠিক থাকার পরও শুধুমাত্র “সমঝোতার বাইরে” থাকার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান অর্ডার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ ওঠে না, লোকসান জমতে থাকে, ব্যাংকের কিস্তি অনাদায়ী হয়। একসময় সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই ‘ঋণখেলাপি’ তকমা নিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটতে হয়। যে মানুষটা সারাজীবনের ঘাম ঝরিয়ে, স্বপ্ন বুনে একটি ফিড মিল গড়ে তুলেছিল, সে শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে যায়। শুধু একটি ব্যবসা নয়, ধসে পড়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ আর সম্মান। অন্যদিকে, এই ব্যবস্থার মূল সুবিধাভোগী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানিতে বদলি বা নতুন পদে গিয়ে একই কৌশলে আবারও দুর্নীতির চক্র চালু করেন। ব্যক্তি বদলায়, চেয়ার বদলায়, কিন্তু পদ্ধতি বদলায় না। তাদের জন্য এই ব্যবস্থা যেন এক নিরাপদ খেলার মাঠ—যেখানে নিয়ম ভাঙলেও শাস্তির ঝুঁকি কম, আর লাভের অঙ্ক আকাশচুম্বী। সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো—এই পুরো প্রক্রিয়াটি বাইরে থেকে ধর্ম, নৈতিকতা আর নিয়মকানুনের মোড়কে ঢাকা থাকে। বক্তৃতায় নৈতিকতার কথা বলা হয়, সমাজে সম্মান বজায় রাখা হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে শোষণ আর লুটপাটের রাজনীতি। যারা সৃষ্টি করে, তারা ধ্বংস হয়; আর যারা ব্যবস্থাকে কৌশলে ব্যবহার করে, তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শুধু কয়েকটি ফিড মিল নয়, পুরো শিল্পখাতই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। উদ্যোক্তাদের আস্থা ভেঙে যাবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, আর বাজার আরও বেশি করে সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি হয়ে পড়বে। এখনই যদি এই অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী দুর্নীতিচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এর মূল্য দিতে হবে পুরো অর্থনীতি এবং সংশ্লিষ্ট হাজারো পরিবারকে। উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু বাস্তবসম্মত উপদেশ: বর্তমান বাস্তবতায় ফিড মিল বা যে কোনো শিল্পখাতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তাই উদ্যোক্তাদের আবেগ নয়, কৌশল আর দূরদর্শিতার ওপর ভর করে এগোতে হবে।
সবশেষে, আবেগ নয়—ডকুমেন্টেশন, চুক্তি আর আইনি সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আজকের বাজারে শুধু “ভালো সম্পর্ক” যথেষ্ট নয়; নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাগজে-কলমে শক্ত অবস্থান দরকার। কর্মকর্তাদের জন্য নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের নীতিমালা: যেসব কর্মকর্তা একটি শিল্পখাতের ক্রয়-বিক্রয় ও সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখেন, তাদের দায়িত্ব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়—তাদের সিদ্ধান্তে পুরো একটি খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নৈতিকতা যেন শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত বা সামাজিক ইমেজে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একটি কোম্পানিকে নয়, বহু পরিবার ও একটি পুরো খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। লেখকঃ মোহাম্মদ ফাহিম, আইডিয়া ট্রেড কর্পোরেশন, ঢাকা, বাংলাদেশ। |







