| বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো এইবছর বাংলাদেশে উদযাপিত হয়েছে বিশ্ব ‘ওয়ান হেলথ দিবস ২০২৫’। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পুনর্ব্যক্ত হয়েছে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যের আন্তঃসম্পর্ককে স্বীকার করে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক কাঠামো ‘ওয়ান হেলথ’-এর মাধ্যমে একটি টেকসই ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার।
আইসিডিডিআর, বি, বাংলাদেশ সরকার, ওয়ান হেলথ সেক্রেটারিয়েট এবং ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের সহযোগিতায় ১২ নভেম্বর ২০২৫ প্রতিষ্ঠানটির সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেন জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুই শতাধিক প্রতিনিধি। দিবসটির এই বছরের প্রতিপাদ্য ছিল “ওয়ান হেলথ: একটি নিরাপদ বিশ্বের জন্য একসাথে”, যা মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে এক অভিন্ন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রক্ষার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। দিবসটি উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল ওয়ান হেলথ বিষয়ে মূল উপস্থাপনা, পোস্টার প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ, এবং “ওয়ান হেলথ ইন অ্যাকশন” শীর্ষক এক প্রাণবন্ত প্যানেল আলোচনা, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের সহযোগিতায় রোগ সার্ভেইল্যান্স থেকে শুরু করে পরিবেশ সংরক্ষণ পর্যন্ত নানা উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, “ওয়ান হেলথ বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশসহ উন্নত দেশগুলোর জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের এই অনুষ্ঠান আমাদেরকে সুযোগ করে দিবে সমস্যাগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং দেশের কল্যাণে বাস্তবায়নযোগ্য সহজ পদক্ষেপ নির্ধারণের।”
অনুষ্ঠানে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসেন চৌধুরী এবং প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনটি পরিচালনা করেন আইসিডিডি আর,বি-র সায়েন্টিস্ট ড. সুকান্ত চৌধুরী এবং সভাপতিত্ব করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর পরিচালক ড. তাহমিনা শিরিন। অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যে ওয়ান হেলথ বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক, প্রফেসর ড. নীতিশ চন্দ্র দেবনাথ তুলে ধরেন কীভাবে ওয়ান হেলথ আন্দোলন জনস্বাস্থ্যের প্রাথমিক পথিকৃৎদের হাত ধরে শুরু হয়ে মহামারি প্রস্তুতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বৈশ্বিক কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, “আইসিডিডিআর, বি থেকেই অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে মিলে আমাদের ওয়ান হেলথ যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমি আনন্দিত যে এইবার তারা অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছে, এবং আশা করি এই অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।” তিনি উল্লেখ করেন যে জুনোটিক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো হুমকিগুলি আর বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয় সম্মিলিতভাবে কাজ করলেই টেকসই সমাধান আসবে। মো. আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, “আমরা আমাদের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছি। তাই সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে, তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে-নাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।” ড. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, “ওয়ান হেলথ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আরও শক্তিশালী সহযোগিতা এবং জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট প্রয়োজন।” ড. তাহমিনা শিরিন বলেন, “আজ আমরা ওয়ান হেলথ পদ্ধতির মাধ্যমে একটি সুস্থ ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি। রোগ সার্ভেইল্যান্স ও প্রাদুর্ভাব অনুসন্ধানের জাতীয় ফোকাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিডিডিআর, বিকে ধন্যবাদ, যারা সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে মিলে দেশে ওয়ান হেলথ উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে।” বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জুনোটিক রোগের ঝুঁকি কমাতে করণীয় কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন। বিশেষভাবে আলোচিত হয় মানুষের মধ্যে পুনরায় দেখা দেওয়া বার্ড ফ্লু (এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা) এবং এর বিস্তৃত সংক্রমণ ঝুঁকি, যা এখন পোলট্রি ও বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীতে ছড়িয়ে পড়ছে। আলোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের সুরক্ষা, টিকাদান কৌশল, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক অর্থায়ন সংকটের প্রেক্ষাপটে রোগ প্রতিরোধে প্রাণী কল্যাণের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপস্থাপন করা ১০টি পোস্টারের মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের পছন্দের ভিত্তিতে সেরা তিনটি দলকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার প্রদান করা হয়। প্রতি বছর ৩ নভেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত ওয়ান হেলথ দিবস মানুষ, প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রে গভীর আন্তঃসম্পর্কের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে। ওয়ান হেলথ পদ্ধতি নানা শাখার মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলে-যার মাধ্যমে ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্ভব হবে আগামী প্রজন্মের জন্য। |









