| বাংলাদেশে নিরাপদ ও মানসম্মত ব্রয়লার উৎপাদন এখন সময়ের দাবি। ভোক্তারা ক্রমেই স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠছে, তাই এন্টিবায়োটিক-মুক্ত, পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও নিরাপদ মাংস উৎপাদনের জন্য আধুনিক বায়োটেকনোলজির ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে বায়োটেকনোলজি ভিত্তিক ফিড অ্যাডিটিভ, এনজাইম, প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক ও সঠিক বায়োসিকিউরিটি প্র্যাক্টিসের মাধ্যমে ব্রয়লার উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার জনপ্রিয় করা গেলে উৎপাদন খরচ কমবে, মুরগির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে তা হবে কার্যকর হাতিয়ার।
এনজাইম টেকনোলজির প্রয়োগ: ব্রয়লারের ফিডে ব্যবহৃত নানা উপাদানের মধ্যে কিছু জটিল কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার ও প্রোটিন থাকে যা মুরগি সহজে হজম করতে পারে না। এই অদাহ্য অংশকে ভেঙে সহজপাচ্য করতে এনজাইম টেকনোলজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন—এন এস পি এনজাইম, জাইলেনেজ, প্রোটিয়েজ, অ্যামাইলেজ, বিটা-গ্লুকানেজ ইত্যাদি এনজাইম ফিডের পুষ্টিগুণের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ায়, ব্লাড লেভেলে দরকারি পুষ্টির বায়ো এভেইলএবিলিটি বাড়ায়, ফিড কনভারশন রেশিও (FCR) উন্নত করে ও মলত্যাগের দুর্গন্ধ কমায়। ফলে ফিডের অপচয় কমে এবং পরিবেশও থাকে স্বাস্থ্যসম্মত। ট্রেস অর্গানিক মিনারেলসের গুরুত্ব: ব্রয়লারের শরীরে মিনারেলের ঘাটতি রোগপ্রবণতা বাড়ায় ও উৎপাদন কমায়। বায়োটেকনোলজি নির্ভর ট্রেস অর্গানিক মিনারেলস যেমন—জিঙ্ক, কপার, ম্যাঙ্গানিজ ও সেলেনিয়ামের চিলেটেড ফর্ম শরীরে সহজে শোষিত হয়। এগুলো ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, হাড়ের গঠন মজবুত রাখে ও মাংসের গুণমান উন্নত করে। ফলে মুরগি সুস্থ থাকে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভরতা কমে যায়। এসিডিফায়ার ব্যবহারের উপকারিতা: এসিডিফায়ার হচ্ছে এমন কিছু জৈব অ্যাসিড যা ফিড ও পানির পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করে অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া যেমন E. coli ও Salmonella এর বৃদ্ধি রোধ করে। এটি হজমতন্ত্রে উপকারী মাইক্রোফ্লোরাকে সক্রিয় রাখে, ফলে পুষ্টি গ্রহণ ও ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে। এসিডিফায়ার ব্যবহারে এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রমোটারের বিকল্প হিসেবে কাজ করা সম্ভব হয়। ফাইটোজেনিক ফিড অ্যাডিটিভসের ভূমিকা: উদ্ভিদজাত নির্যাস থেকে তৈরি ফাইটোজেনিক অ্যাডিটিভস যেমন জৈষ্টমধু, রসুন, আদা, হলুদ, দারচিনি, লবঙ্গ সহ উন্নত হার্বসের ইত্যাদি উপাদান প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণে সমৃদ্ধ। এসব উপাদান মুরগির হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে, ফিড গ্রহণ বাড়ায় এবং মাংসে প্রাকৃতিক স্বাদ ও রঙ উন্নত করে। পাশাপাশি ভোক্তার কাছে এটি “ন্যাচারাল” ও “কেমিক্যাল-ফ্রি” হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক ও সিম্বায়োটিকসের ব্যবহার: বায়োটেকনোলজির অন্যতম সফল উদ্ভাবন প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক প্রযুক্তি। প্রোবায়োটিক হচ্ছে জীবন্ত উপকারী ব্যাকটেরিয়া, যা অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দমন করে হজম শক্তি বাড়ায়। প্রিবায়োটিক হলো সেই পুষ্টি যা প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াকে খাদ্য জোগায়। উভয়ের সমন্বয়ে তৈরি সিম্বায়োটিকস মুরগির অন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখে, ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। বায়োসিকিউরিটি ও গুড পোল্ট্রি কিপিং প্র্যাক্টিস: নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদনে সঠিক বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। খামারের প্রবেশপথে জীবাণুনাশক ব্যবস্থা, জুতা-হাত ধোয়া, ফিড ও পানির স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগাক্রান্ত পাখির দ্রুত আলাদা করণ—এসবই একটি শক্তিশালী বায়োসিকিউরিটি প্ল্যানের অংশ। পাশাপাশি “গুড পোল্ট্রি কিপিং প্র্যাক্টিস” যেমন সঠিক তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল, আলোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখলে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ে এবং রোগপ্রবণতা অনেক কমে যায়। ক্রিটিক্যাল অ্যামাইনো এসিড: অ্যামাইনো এসিডগুলো প্রোটিনের বিল্ডিং ব্লক। ব্রয়লারদের জন্য সব অ্যামাইনো এসিড সমানভাবে জরুরি না — কিছু অ্যামাইনোএসিড “লিমিটিং” হিসেবে কাজ করে; অর্থাৎ এগুলোর ঘাটতি হলে অন্যান্যগুলো বহুদূর পর্যন্ত কাজে লাগতে পারে না। সাধারণভাবে ব্রয়লার ফিডে Methionine, Lysine, Threonine, Tryptophan এবং Arginine—এই ঝাঁকিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এই অ্যামাইনো এসিডগুলো পেশী গঠন, পালক ও ত্বক গুণমান, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, এবং হরমোন ও এনজাইম সংশ্লেষণে সরাসরি অবদান রাখে। উপযুক্ত মাত্রায় না থাকলে বৃদ্ধি ধীর হয়, ফিড ইনটেক কমে যেতে পারে এবং ফিড কনভারশন খারাপ হয়। বাংলাদেশে ভোক্তার জন্য নিরাপদ ব্রয়লার উৎপাদনে বায়োটেকনোলজির ব্যবহার শুধু একটি আধুনিক উদ্যোগ নয়, এটি একটি টেকসই ও ভোক্তা-নিরাপত্তা ভিত্তিক উৎপাদন কৌশল। এনজাইম, ফাইটোজেনিকস, ট্রেস মিনারেল, প্রোবায়োটিক-প্রিবায়োটিক এবং বায়োসিকিউরিটির সমন্বিত প্রয়োগে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্রয়লার উৎপাদন সম্ভব। তাই এখন সময় এসেছে এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার জনপ্রিয় করার মাধ্যমে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পকে নিরাপদ খাদ্য ও উন্নত জীবিকার দিক দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার। ভোক্তা নিরাপদ ব্রয়লার মাংসে আস্থা যত বেশি রাখতে পারবে, দেশে ব্রয়লার মাংসের চাহিদা সে হারে বাড়বে, ফলে একটি স্থিতিশীল ব্রয়লার বাজার ও দামের নায্যতাও প্রতিষ্ঠিত হবে। লেখক: অঞ্জন মজুমদার, পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট। |







