| গ্রামীণ সড়কের পাশেই টিনের চারচালা ছাউনি দেওয়া ছোট্ট কিন্তু পরিপাটি একটি স্থাপনা। নেই কোনো আলাদা গেট বা আনুষ্ঠানিকতা। তাই সকাল থেকে সন্ধ্যা—যখনই প্রয়োজন, কৃষকেরা অনায়াসে ঢুকে পড়েন এখানে। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বসার জন্য রাখা সোফা। সেখানে বসেই চলে চাষাবাদ নিয়ে আলোচনা, সমস্যার কথা বলা, আবার কখনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। কৃষি বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ না কেউ সব সময় উপস্থিত থাকেন। ছোটখাটো সমস্যার সমাধান হয় সঙ্গে সঙ্গেই। আর সমস্যা জটিল হলে কৃষককে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি মাঠে ছুটে যান সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তা। এই আন্তরিক সেবার কারণে অল্প সময়েই জায়গাটি কৃষকদের আস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
দেখতে সাধারণ কোনো বাড়ি মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি কৃষিসেবাকেন্দ্র। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার সাইতারা ইউনিয়নের খোচনা গ্রামে অবস্থিত এই কেন্দ্রটির নাম ‘গ্রাসরুট সার্ভিস আউটলেট’, স্থানীয়ভাবে পরিচিত তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্র নামে। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষি সংক্রান্ত পরামর্শ ও সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গত ১৫ জুন কেন্দ্রটি চালু করা হয়। চালুর পর থেকেই কৃষকদের উপস্থিতি বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে দেড় শতাধিক কৃষক এখান থেকে সেবা নিচ্ছেন। এই সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তা স্থানীয় যুবক আসেফ রহমান রিফাত। নিজ জমিতেই তিনি কেন্দ্রটি গড়ে তুলেছেন। রিফাত জানান, এখানে আসা যে কোনো কৃষকের সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়। ফসলের রোগ বা উৎপাদনসংক্রান্ত বিষয় হলে মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে সমাধান দেওয়া হয়। উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরামর্শ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার লক্ষ্য—আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলে কৃষকদের লাভবান করা। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি-রেইনস) প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে এ ধরনের তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি শুরু হয়। এখন পর্যন্ত ১৪টি জেলায় ৬০টি সেবাকেন্দ্র চালু হয়েছে। দিনাজপুর জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই একটি করে কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে কৃষকেরা ফসল উৎপাদন, রোগবালাই, বীজ নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ পাচ্ছেন। রিফাত বলেন, তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান। মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, কৃষকেরা নানা ধরনের সমস্যায় পড়েন, বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় লাভ কমে যায়। তার বিশ্বাস, মানসম্মত ও টেকসই কৃষির দিকে যেতে পারলে কৃষকের জীবন বদলানো সম্ভব। এমবিএ শেষ করার পরও সেই চিন্তা থেকেই তিনি কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে কৃষি অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে এই সেবাকেন্দ্র চালু করেন। শুরুতে অল্প কয়েকজন কৃষক এলেও এখন উপকার বুঝে অনেকেই নিয়মিত আসছেন। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি নিজের অর্থ ব্যয় করে তিনি কেন্দ্রটির ভেতরের পরিবেশ সাজিয়েছেন। কৃষকদের বসার ব্যবস্থা, বইয়ের তাক, প্রদর্শনী ও বিক্রির জন্য বীজ ও কৃষি উপকরণ রাখা হয়েছে। রয়েছে ছোট কৃষিযন্ত্র ভাড়ার ব্যবস্থা। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি সেবা ও মাটি পরীক্ষার সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি বড় কক্ষে কয়েকজন কৃষক সোফায় বসে গল্প করছেন। পাশেই বসে আছেন নারী কৃষকরাও। এক কোণে বসে রিফাত একজন কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছেন, আর বাকিরা মনোযোগ দিয়ে তা শুনছেন। দেয়ালে ঝোলানো পোস্টারে ফসলের রোগ, লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে। বুকশেলফে কৃষিবিষয়ক বই, আর এক পাশে সাজানো বিভিন্ন ফসলের বীজ। পশ্চিম সাইতারা গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখানে এলে কৃষকদের সম্মান দেওয়া হয়। বসতে বলা হয়, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা হয়। কয়েক মাস ধরে পরামর্শ নিয়ে তিনি কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাচ্ছেন। এই কেন্দ্র থেকে পরামর্শ নিয়ে অনেক নারী কৃষক বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে সবজি চাষ করছেন। তাদের একজন পিংকি আক্তার জানান, পুকুরপাড়ে সবজি ও ফলের চারা লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা তিনি এখান থেকেই পেয়েছেন। তার মতে, এটি শুধু সেবাকেন্দ্র নয়, এক ধরনের কৃষি পাঠাগারও। কৃষকেরা জানান, চাষাবাদ ছাড়াও পণ্য বিপণন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও ঋণসংক্রান্ত নানা তথ্য তারা এখান থেকে জানতে পারছেন। জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নেওয়া হয়। চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা বলেন, আধুনিক সময়ে কৃষককে টিকে থাকতে হলে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন ও বাজার সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের সেই দিকনির্দেশনাই দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারিত হলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি কৃষি খাতও আরও শক্তিশালী হবে। |







