ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারিদের ঋণ সুবিধা নিশ্চিতের আশ্বাস মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর

ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারিদের কৃষি ঋণের আদলে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধার আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি। আজ ১৮ জুলাই দুপুরে টাঙ্গাইল মডেল সিটিতে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) আয়োজিত পোল্ট্রি খামারি সমাবেশ ও মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, ফিডের দাম সহনীয় রাখা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, বিপিআইএ’র নেতৃবৃন্দ এবং ফিড, কাঁচামাল ও একদিনের বাচ্চা সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ইতোমধ্যে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। সবাইকে নিয়ে বসে কীভাবে এসব সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে আনা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এজন্য উপজেলা ও থানা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। অযথা অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া কেউ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না।

সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় পোল্ট্রি খামারিদেরও কৃষি কার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগামী বাজেট বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ধাপে ধাপে কৃষি কার্ড বিতরণ করা হবে। চলতি বছর কৃষক ৪৩ লাখ কৃষক কার্ড পাবেন এবং পর্যায়ক্রমে সব কৃষক ও পোল্ট্রি খামারিদের এ সুবিধার আওতায় আনা হবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা সহজেই পাবেন।

বিপিআইএ সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরীর বলেন, মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ইতোমধ্যে পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়নে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, তাতে আমরা আশান্বিত। পোল্ট্রি শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতেও এ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রান্তিক ও বৃহৎ খামারিদের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান, যাতে ছোট-বড় সকল খামারি তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতভাবে পান। এছাড়া ডিমের বাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভাঙতে তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারে প্রশাসক নিয়োগের আহ্বান জানান।

সংগঠনের মহাসচিব এম. সাফির রহমান বলেন, ডিমের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি খামারিদের ন্যায্য অধিকার। খামারিরা দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাঁরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হন। এই বাস্তবতার পরিবর্তন জরুরি। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট খামারিদের স্বার্থে স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান, বিদ্যুৎ বিলে রিবেট সুবিধা চালু, খামারিদের জন্য একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন সহায়তা প্রদানের দাবি জানান।

প্রচার সম্পাদক ড. শফিকুল বলেন, ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে রেডিও, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সহযোগিতা কামনা করেন।

প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডাঃ মোঃ বয়জার রহমান বলেন, ডিমের উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, পোল্ট্রি নীতিমালা ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। এ নীতিমালার আলোকে একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হবে, যার মাধ্যমে খামারিরা নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা পাবেন। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে খামারিদের আরও সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। এ বিষয়ে তিনি সকল খামারির প্রতি আহ্বান জানান।

যুগ্ম সচিব আহমেদ বলেন, প্রাণিসম্পদ (লাইভস্টক) খাতে প্রণোদনা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, খামারিদের জন্য বিদ্যুতে ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে খামারিদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যথাযথ পরামর্শ অনুসরণ করে ওষুধ ব্যবহার করতে হবে।

যুগ্ম মহাসচিব আলমগীর হোসেন বলেন, পোল্ট্রি খামারিদের স্বার্থে ফার্মার্স কার্ড চালু করতে হবে। তিনি খামারিদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ বিলে রিবেট সুবিধা প্রদানের দাবি জানান।

যুগ্মসচিব অঞ্জন মজুমদার বলেন, পোল্ট্রি শিল্পের মূল ভিত্তি গ্রামবাংলার খামারিরা। দেশের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে তাঁদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি খামারিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, আজকের সেমিনারে উত্থাপিত বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের লক্ষাধিক খামারি উপকৃত হবেন। পাশাপাশি পোল্ট্রি খাতকে আরও আধুনিক ও তথ্যনির্ভর করতে খামারিদের জন্য একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ চালুর উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন।

টাঙ্গাইলের খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, খামারিরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করছেন। তাই রাষ্ট্রেরও উচিত খামারিদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, পোল্ট্রি খাতকে আরও সুশৃঙ্খল ও আধুনিক করতে খামারিদের জন্য একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ চালু করা জরুরি। পাশাপাশি উৎপাদিত ডিম ও অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণের সুবিধা নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের দাবি জানান।

কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা বিপিআইএ-এর আহ্বায়ক সাদেকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে ডিম বিক্রি করতে করতে অনেক খামারি আজ সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি পোল্ট্রি ফিড ও ওষুধের মূল্য কমানোর জন্য সরকারের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

টাঙ্গাইল জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ উসমান গনি খামারিদের সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় চারটি ভেটেরিনারি ল্যাবরেটরি সেবা (Laboratory Service) চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে খামারিরা দ্রুত ও উন্নত রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা পাবেন।

বিপিআইএ টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি শওকত আলী মোল্লার সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমান, টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. রবিউল ইসলাম, বিপিআইএর কেন্দ্রীয় সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী, মহাসচিব এম. সাফির রহমান এবং জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ উসমান গনি। এ সময় জেলার প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারিদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিপিআইএর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।