| দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, পরিবেশে তার বিরূপ প্রভাব বিস্তার করছে ফলে প্রাণীকুলের অস্তিত্ব দিন দিন সংকটাপন্ন অবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ যেখানে সিংহভাগ মানুষের অস্তিত্ব টিকে আছে কৃষি কে কেন্দ্র করে। তাই কৃষিসম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই কৃষিসম্পদের অন্যতম একটি শাখা -মৎস্যখাত। যা বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির অগ্রগতিতে ও সামগ্রিক জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়াও প্রানীজ আমিষের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করছে দেশের মৎস্যসম্পদ। কিন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ব্যাহত করছে ও খরচ বৃদ্ধি করছে।
গ্রীষ্মকালে সূর্যালোক দীর্ঘক্ষণ থাকে ফলে পুকুরের পানির তাপমাত্রা দিনে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং রাতে তুলনামূলক ভাবে কমে যায় অর্থাৎ তাপমাত্রা উঠানামা করে। ফলশ্রুতিতে মাছ চাষে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, মাছের শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমরা জানি অধিকাংশ মাছই শীতল রক্তবিশিষ্ট এবং তাদের দেহে তাপ ধরে রাখার ব্যবস্থা নেই, তাই পরিবেশের তাপমাত্রা দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়ে থাকে। যদিও কিছু কার্প জাতীয় মাছ যেমন- রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি ইউরোথার্মাল শ্রেণিভুক্ত অর্থাৎ এরা বিস্তৃত পরিসরে পানির তাপমাত্রা উঠানামা সহ্য করতে পারে। তবুও গ্রীষ্মের গরমে যখন পানির তাপমাত্রা সহনশীলতার মাত্রা বিশেষ করে কার্প জাতীয় মাছের জন্য ২২-২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস আদর্শ কিন্তু ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর বেশি এবং তেলাপিয়া মাছের জন্য ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে মাছ তখন হিট স্ট্রেস বা তাপজনিত ধকলে পড়ে। এ সময়ে মাছের খাদ্য হজম প্রক্রিয়া ও কোষের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্র নাটকীয়মাত্রায় কমে যায়। গবেষণা তথ্যমতে, গ্রীষ্মের তীব্র গরমে মাছের খাদ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদান ও তার অনুপাত পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তীব্র গরমে সামার মরটালিটি সিনড্রোমের ঝুঁকি থাকে। তাছাড়াও পানির তাপমাত্রা উঠানামা করলে বা বেড়ে গেলে মাছের পাচক এনজাইম যেমন – পেপসি, ট্রিপসিন, অ্যামাইলেজ ও লাইপেজ এর উৎপাদন ও কার্যকারিতা বেড়ে যায় ফলে অন্ত্রের মধ্য দিয়ে অতি দ্রুত খাদ্য স্থানান্তর হয়ে যায়, যেসব মাছের পাকস্থলী বা পৌষ্টিকনালি ছোট বা সুগঠিত নয় সেগুলো তখন সঠিক অনুপাতে পুষ্টি শোষণ করতে পারে না। ফলে খারাব বেশি লাগে কিন্তু মাছের বৃদ্ধি কম হয়। দৈহিক জৈবিক চক্রে বিঘ্ন ঘটে এমন কি হজম প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত জিনগুলোর কার্যকারিতায় পরিবর্তন ঘটে যায় যা মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। এ অবস্থায় মাছের জীবন রক্ষা ও কোষের কার্যক্রম সচল রাখা মূলত রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস (আরওএস), সুপার অক্সাইড ডাইমিউটেজ (এসওডি) এবং ক্যাটালেজ (সিএটি) নামক উপাদানগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস (আরওএস) হলো অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল অক্সিজেন থেকে উদ্ভূত ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানসমূহ যেমন- সুপার অক্সাইড র্যাডিকেল, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, এবং হাইড্রলিক্সল র্যাডিকেল। পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাছের দেহে কোষের বিপাক হার বহুগুণে বেড়ে যায়, এসময় কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া (কোষের শক্তি ঘর) এ অক্সিজোম এর কার্যক্রম বেড়ে যায় ফলে অত্যাধিক পরিমাণে মুক্ত ইলেকট্রন এর প্রবাহমাত্রা বেড়ে যায় যা মাছের শরীরের প্রচুর পরিমানে বিষাক্ত মাত্রায় আরওএস তৈরি করে। একই সাথে পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলে দ্রবীভূত অক্সিজেন ধারণক্ষমতা কমে যায় তখন মাছ আংশিক অ্যানারোবিক (অক্সিজেনহীন) শ্বসন প্রক্রিয়া চালায়, যা শরীরে আরওএস জমানোর গতিকে ত্বরান্বিত করে ফলে ফুলকার মসৃণ রক্ত নালিকায় অক্সিডেটিভ লিসন, হেপাটিক অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হেপাটিক নেক্রসিস, রেনাল হেমোরিস, গাটবল্ট সহ নানা সমস্যা দেখা দেয় মাছের শরীরে। এসময় মাছের দেহে সুরক্ষার প্রথম প্রাচীর হিসাবে সুপারঅক্সাইড ডাইমিউটেজ (এসওডি) উৎপন্ন হয় যা মাছের শরীরের প্রধান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইম যা কোষের সবচেয়ে ক্ষতিকর সুপারঅক্সাইড কে প্রশমিত করে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডে পরিবর্তন করে এবং পরবর্তীতে ক্যাটালেজ (সিএটি) তাৎক্ষণিকভাবে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে ভেঙ্গে সম্পূর্ণ নিরাপদ পানি ও অক্সিজেন এ পরিনত করে। সিএটি এনজাইম টি সর্বদা এসওডি এর সহযোগী হিসাবে কাজ করে। কিন্তু গ্রীষ্মের তাপদহনে যখন মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা দীর্ঘসময় থাকে তখন এই এনজাইম উৎপাদন ব্যাহত হয় ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে, যকৃত, ফুলকা, অন্ত্র, কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়াও অতিরিক্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন (হাইপারক্সিয়া) বা অক্সিজেনের অভাব (হাইপোক্সিয়া), অ্যালকালোসিস বা পিএইচ এর অস্বাভাবিক উঠানামা, আয়ন বা লবণের পরিবর্তন বা অসমোরেগুলেশনে ব্যাহত, অধিক ঘনত্বে মাছ চাষে অধিক মলমূত্র উৎপন্ন হয় ও অব্যবহৃত খাবার পুকুরের তলায় জমা হয়ে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া, নাইট্রেট উৎপাদন করে, নিম্নমানের খাবার বা রেনসিডেটেট টক্সিন বা মাইকোটক্সিন যুক্ত খাবার খাওয়ালে, ভারী ধাতু বা কীটনাশক পুকুরে প্রবেশ করলে বা ইউট্রিফিকেশনের প্রভাবেও হেপাটিক অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে ফলে মাছ রোগজীবাণুর প্রতি অতি সংবেদনশীল হয়ে রোগে আক্রান্ত হয়, মারা যায়। মাছ যখন রোগে আক্রান্ত হয় তখন শরীরের শ্বেত রক্ত কণিকা (যেমন- ম্যাক্রোফেজ) ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবি মারার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে আরওএস তৈরী করে একে বৈজ্ঞানিকভাষায় রেসপিরেটরি বার্স্ট (আরবি) বলে। তবে যখন পানির তাপমাত্রা সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখনই আরওএস মাছের জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত যেমন – গ্রীষ্মকালে খাবারের উপাদানের অনুপাত মৎস্য পুষ্টি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী তৈরি করা, খাবারের সাথে প্রতি সপ্তাহে ১-২ দিন ভিটামিন-সি,ই, ও সেলুনিয়াম এবং স্যালাইন মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। প্রচন্ড গরমের দিনে সকাল ৬-৭ টায় কিছু খাবার দেওয়া এবং বিকাল ৫টার দিকে বাকী খাবার দেওয়া। দুপুরে খাবার দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। অ্যালগাল ব্লুম হলে সেগুলো অপসারণ করতে হবে।সম্ভব হলে মাছের ঘনত্ব কমিয়ে দিন,অ্যারেটর বা পাম্প ব্যবহার করা যেতে পারে, কিছু পানি পরিবর্তন করে নতুন পানি দেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি যেকোনো প্রকার সমস্যা হলে বা পরামর্শের জন্য নিকটস্থ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বা একজন মৎস্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন, যাতে আপনার পরিশ্রম ও সম্পদ অবহেলায় বা ভুল সিদ্ধান্তে নষ্ট না হয়। আপনি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া মানে দেশের উৎপাদন ও সম্পদের ক্ষতি হওয়া। তাই গ্রীষ্মকালীন সময়ে সর্তক ও সচেতন থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে,প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম। মাছ চাষে লাভবান হতে হলে সচেতনতার বিকল্প নাই।
লেখকঃ মাছের চাষ, খাদ্য-পুষ্টি, রোগ ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ- কৃষিবিদ মো: ইব্রাহিম মিয়া, বিএসসি ইন ফিশারিজ, এমএসসি ইন অ্যাকুয়াকালচার। মোবাইলঃ 01798687245, ইমেইলঃ 1906014ebrahimmiah@gmail.com |







