চিংড়ি ও মৎস্য চাষে উন্নত মানের খাদ্যের গুরুত্ব: উৎপাদন প্রক্রিয়া ও খাদ্য উৎপাদনে গবেষণার গুরুত্ব

বিভিন্ন পুষ্টিকারক দ্রব্যাদির সংমিশ্রণে মাছ ও চিংড়ির খাদ্য উৎপাদন অনেকেই সহজ মনে করেন। তাই আমাদের দেশে বহু সাধারণ কোম্পানি মাছ ও চিংড়ির খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন করছেন। প্রকৃতপক্ষে মাছ ও চিংড়ির পুষ্টির সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে উন্নত মানের খাদ্য উৎপাদন, সময়ে সময়ে ফর্মুলার পরিবর্তন, প্রজাতি পরিবর্তনের সাথে সাথে উপাদানের ফরমুলা পরিবর্তন, নতুন উপাদান সংযোজন ইত্যাদি অনেক অনেক কঠিন কাজ। তাছাড়া, কারখানায় সঠিক উৎপাদন প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিক কাজটাই বিজ্ঞানীদের কাজ। মেশিন চালক ও উপাদান মিশ্রনকারীই খাদ্য উৎপাদনের বিশেষজ্ঞ নন।

মাছ ও চিংড়ির খাদ্য উৎপাদনে অনবরত গবেষণা করে ফর্মুলার পরিবর্তন ও উন্নয়ন করতে হয়। তাছাড়া, উৎপাদিত খাদ্য প্রথমে গবেষণাগারে ও পরবর্তিতে খামারে ট্রায়াল দিয়ে ফলাফল নিশ্চিত হয়ে পণ্য বিপণন করতে হয়। এ গবেষণার কাজ করার জন্য বিশ্বের উন্নতমানের সকল ফিড মিলেই গবেষণাগার ও গবেষক আছে। কিন্তু এ কাজটি আমাদের দেশের ফিড মিলগুলো করছে বলে আমার জানা নেই। আমি যুক্তরাজ্যে চিংড়ির ফিড বিষয়ে গবেষণা করার সময় ফিড ফর্মুলা ও উৎপাদন কত জটিল কাজ তা অনুধাবন করেছি।  খাদ্য প্রয়োগ করে মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনের ৭০-৮০% খরচই হয় খাদ্য ক্রয় বাবদ। তাই খাদ্যের এফ. সি. আর একটু কম-বেশীর সাথে লাভ-লোকসান জড়িত।

পিলেট খাদ্যের মান জানার জন্য নিম্নের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণঃ

  • প্রোটিনঃ খাদ্যে মাছ বা চিংড়ির দৈহিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন আছে কিনা। মাছের খাদ্যে ২৫-৩৫% এবং চিড়ির দৈহিক ওজনানুসারে ৩৫-৪৫% প্রোটিন থাকা প্রয়োজন। গবেষণার বিষয়ঃ খাদ্যে কি পরিমাণ আছে তা পরীক্ষা করে নির্ণয় করা।
  • লিপিডঃ লিপিড হল খাদ্যে থাকা চর্বি ও তেল( Fat and Oil). লিপিডের মধ্যে পর্যাপ্ত হাইলি আনসেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড ( হুফা, HUFA)থাকতে হবে। খাদ্যে মাছের জন্য ৪- ৭ ও চিংড়ির জন্য ৬-৭% লিপিড খাকা প্রয়োজন। গবেষণার বিষয়ঃ কি পরিমান লিপিড আছে তা পরীক্ষা করে নির্ধারণ করে লিপিডের পরিমাণ সঠিক পর্যায়ে রাখতে হবে।
  • আঁশঃ মাছের খাদ্যে ইহা উদ্ভিদ জাতীয় পণ্য থেকে পাওয়া যায়। আঁশের মধ্যে মাছের জন্য প্রয়োজনীয় লিগনিন, সেলোলুজ ও হেমিসেলোলুজ থাকে। খাদ্যে আঁশের পরিমান >৪% থাকা প্রয়োজন।
  • এ্যাশ বা ভস্মঃ এ্যাশের মধ্যে মিনারেল ও ট্রেস ইলিমেন্ট থাকে। খাদ্যে ব্যবহৃত ফিস মিল থেকে তা পাওয়া যায়। খাদ্যে ১৫% এর অধিক এ্যাশ থাকা ঠিক নয়।
  • স্বাদঃ খাদ্য পুষ্টিকর হলেই চলবে না; তা প্রণির জন্য সুস্বাদু ও আর্কষণীয় হতে হবে।
  • আদ্রতাঃ <১২% হতে হবে।
  • ক্যালসিয়ামঃ ২.৩% থাকা উত্তম।
  • ফসফরাসঃ ১.৫% এর অধিক থাকা প্রয়োজন।
  • আকারঃ মাছ বা চিংড়ির বয়স বা আকারের সাথে পিলেটের আকারের সামজস্য আছে কিনা এবং মাছ ও চিংড়ি তা ভক্ষণ করতে পারছে কিনা তা গবেষণা করে জানতে হবে।
  • আকৃতিঃ সকল কনার রং একই রকম না হলে মনে করতে হবে খাদ্যের সকল উপাদান ভালভাবে মিশ্রিত হয়নি।
  • পানিতে স্থায়িত্বঃ খাদ্য সরবরাহের পর ১থেকে ২ ঘন্টা সময় পর্যন্ত তা পানিতে শক্ত থাকতে হবে।খাদ্য দ্রুত ভেঙ্গে গেলে একদিকে পুষ্টি উপাদান চুইয়ে বের হয়ে যাবে, অন্যদিকে তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কনা হয়ে যাওয়ার ফলে মাছ ও চিংড়ি ভক্ষণ করতে পারবে না।
  • খাদ্য হজম করাঃ খাদ্যের সকল উপাদান মাছ ও চিংড়ি হজম করতে পারল কি না গবেষণা করে নিশ্চিত হতে হবে। কোন সমস্যা পরিলক্ষিত হলে খাদ্যের উপাদান পরিবর্তন করে সহজপাচ্য উপাদান মিশ্রিত করতে হবে।
  • পুষ্টি উপাদান লিচিং বা চুইয়ে পানিতে চলে যাওয়াঃ খাদ্যের পুষ্টি উপাদানসমুহ কমপক্ষে ১ ঘন্টার পুর্বে; অর্থাৎ মাছ ও চিংড়ি খাদ্য ভক্ষণ করার পুর্বে পানিতে চুইয়ে চলে যাওয়া ঠিক নয়।
  • খাদ্যে হুফা (HUFA) বা হাইলি আনছেচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের( ওমেগা ৩) পরিমান। গবেষণার বিষয়ঃ খাদ্যের লিপিড বের করে এর মধ্যে কি পরিমাণ হুফা আছে নির্নয় করতে হবে।
  • খাদ্য মেয়াদোত্তীর্নের বৈশিষ্ট্য। গবেষণার বিষয়ঃ উৎপাদিত খাদ্য কয়েক দিন অন্তর অন্তর রাসায়নিক পরীক্ষা করে কখন এর গুণাগুণ নষ্ট হয় বা কখন তা মেয়াদোত্তীর্ণ হয় তা জানতে হবে। এরপর এ তথ্য খাদ্যের বস্তা বা মোড়কে লিখে দিতে হবে।
  • খাদ্যের এনার্জি বা শক্তিঃ খাদ্যে কত কিলোক্যালোরি শক্তি আছে তাই হল খাদ্যের এনার্জি। গবেষণার বিষয়ঃ পরীক্ষা করে জানতে হবে খাদ্যে মোট কত কিলোক্যালোরি শক্তি আছে এবং এ শক্তির মধ্যে কি পরিমাণ মাছ ও চিংড়ি হজম করে শরীরে গ্রহণ করতে পারে।
  • ভিটামিনসমূহঃ নির্দিষ্ট পরিমাণ বিভিন্ন ভিটামিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করে নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের এ্যাকুয়াকালচারের উন্নয়নের জন্য যুক্তিসঙ্গত মুল্যে উন্নতমানের খাদ্য উৎপাদন বা সহজে আমদানি বা আন্তর্জাতিক কোম্পানি কতৃক বাংলাদেশে এ্যাকুয়াফিড মিল স্থাপনের ব্যবস্থা করা জরুরী প্রয়োজন। চিংড়ি ও মৎস্য চাষের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে হলে অবশ্যই স্ক্রেটিং, কারগিল, নিউভিয়া, ইউনি-প্রেসিডেন্ট, আবন্তী,বায়োমার ইত্যাদির মত উন্নত মানের খাদ্য অবশ্যই সহজলভ্য করতে হবে। আমদানিকৃত খাদ্যের অপ্রয়োজনীয় টেষ্ট ও পোর্টে ঝামেলা বন্ধ করে আমদানি সহজতর করতে হবে।