সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া থেকে ইউরিয়া কিনবে সরকার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সারবাজারে উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সংকট দেখা দেওয়ায় দেশের কৃষি খাতে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়া থেকে সরাসরি ইউরিয়া সার আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

বুধবার (১৭ জুন) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সার উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী দেশগুলোতে উৎপাদন, পরিবহন এবং লজিস্টিক কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের চাহিদা অনুযায়ী সার সংগ্রহে জটিলতা দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক কোটেশন প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বান করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া মিনি পিক সিজন এবং পরবর্তী পিক সিজনের জন্য পর্যাপ্ত সারের মজুত নিশ্চিত করাকে জরুরি বলে মনে করছে সরকার। কৃষকদের কাছে সারের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বিকল্প উৎস থেকে আগাম আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডেল্টা স্টার ট্রেডিং এফজেড-এলএলসি, যার স্থানীয় এজেন্ট আবেদিতা ট্রেডিং, ঢাকা এবং রাশিয়ার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পিজেএসসি আরকনের কাছ থেকে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) বিদ্যমান সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির মূল্যসূত্র অনুসরণ করে লটভিত্তিক মোট এক লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ৪০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানি করা হবে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানান, দেশের চাহিদার তুলনায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ইউরিয়া সার পর্যাপ্ত নয়। ফলে প্রতিবছরই বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হয় এবং এ ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জি-টু-জি চুক্তির আওতায় সার সংগ্রহ করে থাকে। তিনি জানান, বৈঠকে রাশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানির প্রস্তাবেও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এদিকে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পাশাপাশি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকেও দেশে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ইউরিয়া সার এবং শিল্পখাতের কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করতে মোট ৭০৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৯৭৮ টাকার তিনটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৫০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪৮ কোটি ৫৫ লাখ ৫৯ হাজার ৩০০ টাকা। ডেল্টা স্টার ট্রেডিং এফজেড-এলএলসি থেকে এই সার আমদানি করা হবে। প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০৭ দশমিক ০১ মার্কিন ডলার, যার মধ্যে এফওবি মূল্য, ফ্রেইট চার্জ এবং ব্যাগিং ও স্থানীয় পরিবহন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া সৌদি আরবের সাবিক অ্যাগ্রি-নিউট্রিয়েন্টস কোম্পানি থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১৯তম লটের ২৫ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ খাতে ব্যয় হবে ১৮৫ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৪৩৭ টাকা ৫০ পয়সা।

একই সঙ্গে টিএসপিসিএলের জন্য ১৫ হাজার মেট্রিক টন রক সালফার বা ব্রাইট ইয়েলো সালফার আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হবে ১৭১ কোটি ১ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকা। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ফ্যাবসকো কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, সেশেলস থেকে এ সালফার আমদানি করা হবে, যা বিশ্বের বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আগাম এ উদ্যোগ দেশের কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এবং কৃষকদের কাছে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।