| জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ গ্রামের সফল পোল্ট্রি উদ্যোক্তা ইসমাঈল হোসেন টুকু এখন এলাকায় এক অনুপ্রেরণার নাম। মাত্র তিনটি সেড ও পাঁচ হাজার সোনালি মুরগির বাচ্চা দিয়ে ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করা তাঁর খামার আজ এক লাখেরও বেশি মুরগির বিশাল পোল্ট্রি কমপ্লেক্সে পরিণত হয়েছে। পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও দৃঢ় মনোবল দিয়েই তিনি আজ প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা।
বর্তমানে তাঁর মালিকানায় তিনতলা ও ছয়তলা বিশিষ্ট আটটি আধুনিক খামার রয়েছে, যেখানে উৎপাদিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ডিম ও মুরগি। ইসমাইল হোসেন টুকুর খামারে এখন প্রায় ৩০ হাজার বাচ্চা, ২০ হাজার পুলেট এবং ৫০ হাজার লেয়ার মুরগি রয়েছে। শুধু উৎপাদনই নয়, তাঁর এই খামার থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় ১২০ জন মানুষ। তিনি গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান—এসএসবি পোল্ট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি কমপ্লেক্স, রাফিদ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, রিফাদ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরও কয়েকটি কৃষি-সম্পর্কিত উদ্যোগ, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইসমাইল হোসেন টুকু বলেন, “আমি শুরু থেকেই সোনালি মুরগি নিয়েই কাজ শুরু করি। এখনো সেই জাতের মুরগিই পালন করি, কারণ এর বাজার চাহিদা বেশি এবং স্থানীয় জলবায়ুর সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নেয়। আমার খামারের সঙ্গে এখন শতাধিক পরিবারের জীবিকা জড়িয়ে আছে। এ খাত আমাকে আত্মনির্ভর করেছে এবং অন্যদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।” ইসমাইল হোসেন টুকুর সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এলাকার অনেক তরুণ উদ্যোক্তা। আক্কেলপুর উপজেলার রুকিন্দিপুর গ্রামের খামারি আইয়ুব আলী বলেন, “আমি আগে অন্য ব্যবসা করতাম। টুকু ভাইয়ের কাছ থেকে ৫০০ পিস সোনালি মুরগির বাচ্চা নিয়ে খামার শুরু করি। এখন আমার তিনটি খামার আছে, যেখানে ১৫ থেকে ২০ হাজার মুরগি পালন করছি। খামারে নিয়মিত ৮ জন কর্মচারী কাজ করছেন। টুকু ভাই আমাকে অনেকভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাই আজ আমি একজন সফল খামারি।” একইভাবে জয়পুরহাট সদর উপজেলার শাহাপুর গ্রামের নুরনবীও টুকুর কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি একসময় বেকার ছিলাম। টুকু ভাইয়ের কাছ থেকে বাচ্চা বাকিতে নিয়ে খামার শুরু করি। মুরগি বিক্রি করে ধীরে ধীরে টাকা পরিশোধ করেছি। এখন আমার নিজস্ব কয়েকটি খামার আছে। টুকু ভাই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন।” খামারের দীর্ঘদিনের কর্মচারী রাজু আহমেদ ও গোলাম মোর্শেদ বলেন, “আমরা আট বছর ধরে ভাইয়ের খামারে কাজ করছি। এখান থেকে যা আয় করি, তা দিয়েই আমাদের পরিবার চলে। আমাদের জীবনে এই খামারই আশীর্বাদ।” আক্কেলপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আমিরুল ইসলাম বলেন, “ইসমাইল হোসেন টুকু জয়পুরহাট তথা আক্কেলপুর উপজেলার অন্যতম সফল খামারি। তাঁর খামার থেকে অনেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের খামার গড়ে তুলেছেন এবং স্বাবলম্বী হয়েছেন। আমরা নিয়মিত তাঁর খামার তদারকি করি এবং পরামর্শ দিই। তাঁর মতো উদ্যোক্তারাই দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছেন।” দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে ইসমাইল হোসেন টুকু আজ শুধু একজন সফল খামারি নন, তিনি একজন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী সামাজিক উদ্যোক্তা। তাঁর খামার থেকে যে ডিম ও মুরগি উৎপাদিত হচ্ছে, তা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়ও ভূমিকা রাখছে। ইসমাইল হোসেন টুকুর সোনালি মুরগির খামার এখন আক্কেলপুর উপজেলার অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর হাত ধরে শতাধিক মানুষ নিয়মিত আয় করছে, অনেক তরুণ নতুনভাবে স্বপ্ন দেখছে, আর গ্রামের নারীরাও পরোক্ষভাবে এই খাতে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁর এই সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক দিকনির্দেশনা, পরিশ্রম ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রামীণ বাংলাদেশেও গড়ে তোলা যায় সফল উদ্যোক্তার দৃষ্টান্ত। ইসমাইল হোসেন টুকুর গল্প আজ শুধু জয়পুরহাটের নয়—এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ উদ্যোগ, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরতার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। |







