পটুয়াখালী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের মতবিনিময় সভা: প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে নতুন দিকনির্দেশনা

শফিকুর রহমানঃ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উদ্যোগে পটুয়াখালী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের আওতাধীন উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, এফএএআই ও এআই টেকনিশিয়ানদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সরকারি নীতিমালা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, মাঠপর্যায়ের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় জাতের উন্নয়ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিবিদ মোঃ শাহজামান খান, পরিচালক, কৃত্রিম প্রজনন দপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ঢাকা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ মাহফুজুল হক, পরিচালক, বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর, বরিশাল এবং ডাঃ মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, উপপরিচালক, জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, ঢাকা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ডাঃ মোঃ হারিবুর রহমান, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পটুয়াখালী। স্বাগত বক্তব্য দেন সুভেন্দ সরকার, উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, পটুয়াখালী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মোঃ সফিকুর রহমান (শশী), উপপরিচালক, কৃত্রিম প্রজনন দপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সভায় জেলার সকল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, এলডিপি কর্মকর্তা ও এলইওগণ উপস্থিত ছিলেন।

প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে পটুয়াখালীর অগ্রযাত্রা: ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত পটুয়াখালী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ৪.২১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্র বর্তমানে জেলার পশুপালন খাতের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে জেলার ১১৬ জন স্বেচ্ছাসেবী এআই টেকনিশিয়ান মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। জেলার গরুর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার এবং মহিষের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার, যা প্রাণিসম্পদ খাতের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।

ধারাবাহিক সাফল্য ও অগ্রগতি: গত কয়েক অর্থবছরে পটুয়াখালী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য ছাড়িয়ে সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২০–২১ অর্থবছরে অর্জনের হার ছিল ১৩১%, ২০২১–২২ ও ২০২২–২৩ অর্থবছরে ১৩৩%, এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরেও ১৩১%। একইভাবে বাছুর উৎপাদনেও হয়েছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি—২০২৩–২৪ অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে ৭,৬৫২টি সংকরজাত বাছুর। চলতি অর্থবছর (২০২৪–২৫)-এর মাঝামাঝি সময়ে ১৯,৫২১টি প্রজনন ও ৭,৬৫২টি বাছুর উৎপাদনের মাধ্যমে যথাক্রমে ১৩১% ও ১২৭% অর্জন সম্পন্ন হয়েছে।

জাত উন্নয়ন ও সিমেন ব্যবস্থাপনা: ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ব্যবহৃত সিমেনের মধ্যে সর্বাধিক ছিল HF ৭৫% জাতের (২৭%), এবং SL ৮৭% জাতের (২১%)। স্থানীয় জাত সংরক্ষণের জন্য RCC জাতের সিমেনও সীমিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব: কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচির ফলে জেলার দুধ ও মাংস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। উন্নত জাতের গরু জন্মের ফলে স্থানীয় পুষ্টি নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো নারীর অংশগ্রহণ—অনেক নারী এখন গবাদিপশু পালন ও দুগ্ধ উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। একই সঙ্গে বেকার তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এআই টেকনিশিয়ান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যা গ্রামীণ পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: কেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—

  • আধুনিক ইনসেমিনেশন ল্যাব স্থাপন
  • ডিজিটাল ডেটা ব্যবস্থাপনা ও জিনগত মূল্যায়ন (genetic evaluation)
  • লোকাল জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন
  • প্রুভেন বুল উৎপাদন কর্মসূচি সম্প্রসারণ

সরকার ইতিমধ্যে ৪টি বিভাগের ১৮টি জেলার ৯৩টি উপজেলায় প্রুভেন বুল উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পটুয়াখালী জেলা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র আজ শুধু একটি দপ্তর নয়—এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, পুষ্টি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার প্রতীক। ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে কেন্দ্রটি প্রমাণ করেছে যে, প্রশিক্ষিত জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক দিকনির্দেশনা মিললে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত টেকসইভাবে উন্নত করা সম্ভব।