| বাংলাদেশ একটি গ্রীষ্মপ্রধান দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্তমান সময়ে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ব্রয়লার শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসে তীব্র দাবদাহ এবং উচ্চ আর্দ্রতার কারণে ব্রয়লার মুরগি ‘হিটস্ট্রেস’ বা তাপজনিত চাপের সম্মুখীন হয়। যেহেতু মুরগির ঘামগ্রন্থি নেই, তাই অতিরিক্ত তাপমাত্রায় তাদের বিপাকীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যা উৎপাদন হ্রাস থেকে শুরু করে গণ-মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।
একটি লাভজনক খামার পরিচালনার জন্য কেবল উন্নত জাতের বাচ্চা বা মানসম্মত ফিডই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় অপরিহার্য। ঘর তৈরির কৌশল, সঠিক বায়ু চলাচল নিশ্চিতকরণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পানির সুশৃঙ্খল ব্যবহার—এই প্রতিটি বিষয় ব্রয়লারের জীবন বাঁচাতে এবং কাঙ্ক্ষিত FCR নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিম্নে গ্রীষ্মকালীন ব্রয়লার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। ১. পরিবেশ ও বায়ু চলাচল (Ventilation Management): গরমের সময় ব্রয়লার পালনে প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম।
২. বিদ্যুৎ ব্যাকআপ ও হিটস্ট্রোক প্রতিরোধ: ব্রয়লার মুরগির শরীরে ঘাম নিঃসরণের গ্রন্থি নেই। তারা মূলত হাপানোর (Panting) মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা রাখে।
৩. লিটার ব্যবস্থাপনা (Litter Management)
৪. ফ্যান ও বাতাস প্রবাহের কৌশল
৫. টিনের চালার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও ফগিং
৬. হিটস্ট্রেসে আক্রান্ত মুরগির জরুরি চিকিৎসা: যখন কোনো মুরগি চরম হিটস্ট্রেসে আক্রান্ত হয়ে ডানা মেলে শুয়ে পড়ে, তখন তাকে পানিতে চুবানো একটি জীবন রক্ষাকারী পদ্ধতি। সতর্কতা: মুরগির নাক বা মুখ দিয়ে পানি ঢুকে গেলে তা সরাসরি ফুসফুসে চলে যায় (Aspiration pneumonia), যার ফলে মুরগিটি তৎক্ষণাৎ মারা যায়। তাই মাথা অবশ্যই পানির উপরে রাখতে হবে। ৭. জায়গার সঠিক ব্যবহার (Floor Space): মুরগির ঘনত্ব তাপ উৎপাদনের প্রধান কারণ। গাণিতিক ব্যাখ্যা: প্রতি ১.৫-১.৭ বর্গফুট জায়গা দিলে মুরগির মাঝে ফাঁকা জায়গা থাকে, ফলে শরীরের তাপ বিকিরণ হওয়ার সুযোগ পায়। ঘনত্বের কারণে “Hot spots” তৈরি হওয়া বন্ধ হয়, যা শীতকালে ১ বর্গফুটে সম্ভব হলেও গ্রীষ্মে মরণফাঁদ হতে পারে। ৮. ফিড রেস্ট্রিকশন ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা: দিনের গরমের সময় (দুপুর ১১টা – বিকেল ৪টা) খাদ্য গ্রহণ বন্ধ রাখা বা কমিয়ে দেওয়াকে Feed Restriction বলে।
গরমে ব্রয়লারের খাদ্য বন্ধ রাখার সময়সূচি (মার্চ-সেপ্টেম্বর):
এভাবে ২২ দিন বয়স থেকে বিক্রি পর্যন্ত সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত খাবার বন্ধ থাকবে।
৯. পানি ও ইলেকট্রোলাইট ব্যবস্থাপনা
যেহেতু রক্ত ঘন হয়ে যায় এবং রক্তচাপের সমস্যা হয়, তাই এসপিরিন ঘন রক্তকে পাতলা রাখতে সাহায্য করে এবং সোডিয়াম বাইকার্বোনেট রক্তের সেই ক্ষারীয় অবস্থাকে (pH) নিয়ন্ত্রণে আনে। হিট-স্ট্রোক মোকাবিলায় কার্যকরী ও পরীক্ষিত ব্যবস্থাপনা: খামারে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। ইলেকট্রিসিটি ব্যাকআপ নিশ্চিত করার পর নিচের পদক্ষেপগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে: ১. হাই-প্রেশার স্প্রে ও স্ট্যান্ড ফ্যানের ম্যাজিক কম্বো: বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও যখন তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে যায়, তখন কেবল ফ্যান যথেষ্ট নয়।
২. ইমার্জেন্সি ‘হাইড্রো-থেরাপি’ (মুরগি ভেজানো): যখন ইলেকট্রিসিটি থাকে না এবং মুরগি হিটস্ট্রোকে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন এটিই জীবনরক্ষাকারী উপায়।
৩. বাহ্যিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ (Roof Cooling)
৪. সাপ্লিমেন্টারি সাপোর্ট: এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল করার পাশাপাশি মুরগির অভ্যন্তরীণ মেটাবলিজম ঠিক রাখতে পানিতে নিচের উপাদানগুলো মেশানো যেতে পারে:
এনভায়রনমেন্ট বা পরিবেশকে বাহ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রণ (Temperature Control) করতে না পারলে শুধু ঔষধ দিয়ে হিট-স্ট্রোক মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব। ফিড রেস্ট্রিকশন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপসমূহ১. ধাপে ধাপে খাদ্য সরবরাহ: খাবার দেওয়ার সময় হঠাৎ সব পাত্র ভর্তি করে খাবার দিলে মুরগি হুড়োহুড়ি করে বেশি খেয়ে ফেলে। এতে শরীরে বিপাকীয় তাপ (Metabolic Heat) হঠাৎ বেড়ে যায় এবং মুরগি তৎক্ষণাৎ স্ট্রোক করতে পারে। তাই অল্প অল্প করে ধাপে ধাপে খাবার দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। ২. সদ্য উত্তোলিত ঠান্ডা পানি: বিকেলে যখন খাবার দেওয়া শুরু করবেন, তার ঠিক আগেই পুরোনো গরম পানি ফেলে দিয়ে টিউবওয়েলের সদ্য উত্তোলিত ঠান্ডা পানি দিতে হবে।
৩. বিটেইন (Betaine) এর ভূমিকা: আপনি ঠিকই বলেছেন, বিটেইন মিশ্রিত পানি এই সময়ে লাইফ-সেভার হিসেবে কাজ করে।
৪. বসার জায়গা নিশ্চিত করা: বিকেলে যখন ফিড দেওয়া হয়, তখন অনেক সময় মুরগি জটলা পাকিয়ে ফেলে। তাই ফিড দেওয়ার পর মুরগি যেন একে অপরের গায়ের সাথে লেগে না থাকে বা গাদাগাদি না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফিড দেওয়ার সময়সূচী ও প্রস্তুতি
লেখক পরিচিতিঃ ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন একজন অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ান ও পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ। তিনি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (SAU) থেকে ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন (DVM) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোল্ট্রি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর (MS) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি এগ্রিগেট নেটওয়ার্ক লিমিটেডে এ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (CBF) ও রাজশাহী ব্রাঞ্চ ইন-চার্জ হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি কাজী ফার্মস এবং নীলসাগর এ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মাঠপর্যায়ে ব্রয়লার ফার্মিং ম্যানেজমেন্ট, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল এবং পোল্ট্রি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তার উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। |








