গ্রীষ্মের তীব্র গরমে মাছ চাষের সম্ভাব্য ঝুঁকি, করণীয় পদক্ষেপ ও পরিচর্যা: কৃষিবিদ মো: ইব্রাহিম মিয়া

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি সকল প্রানীকূলের উপর পড়ছে। জলজ প্রাণী – মাছ তার ব্যতিক্রম নয়।কয়েকদিন যাবৎ অসহনীয় তীব্র গরমে বা তাপপ্রবাহে পুকুরের পানির তাপমাত্রা ৩২° সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেছে যা মাছের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে । এ সময় সঠিক পদক্ষেপ না নিলে পুকুরের সমস্ত মাছ মারা যাওয়ার মতো বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

নিচে তীব্র গরমে মাছ চাষের প্রধান ঝুঁকিগুলো এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় করণীয় বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

তীব্র গরমে মাছ চাষের সম্ভাব্য ঝুঁকি সমূহ-

অক্সিজেন সংকট: গরম বাড়লে পানিতে অক্সিজেন দ্রবীভূত হওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ভোরবেলা বা রাতে মাছ অক্সিজেনের অভাবে পানির ওপরে ভেসে ওঠে এবং হা করে বাতাস খাওয়ার চেষ্টা করে।

বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি: পুকুরের তলায় জমে থাকা কাদা, মল ও অতিরিক্ত খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় দ্রুত পচে যায়। এতে অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড ও মিথেনের মতো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়।

মাছের মড়ক ও রোগবালাই: অতিরিক্ত গরমে মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, হিট স্ট্রেস হয়। ফলে ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীজনিত রোগ (যেমন: ফুলকা পচা বা ক্ষত রোগ) দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সাধারণ ব্যাকটেরিয়া যেখানে অতিরিক্ত গরমে মারা যায়, সেখানে থার্মোফাইল ব্যাকটেরিয়াগুলোর শরীরে বিশেষ ধরনের তাপ-সহনশীল এনজাইম (Heat-stable enzymes) এবং মজবুত কোষ প্রাচীর থাকে। এই বিশেষ গঠনের কারণে ফুটন্ত গরম পানিতেও এদের ভেতরের প্রোটিন বা ডিএনএ নষ্ট হয় না এবং পোষক বা হোস্ট ছাড়াই দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে।উদাহরণস্বরূপ: থার্মাস অ্যাকুয়াটিকাস (Thermus aquaticus) নামের একটি বিখ্যাত থার্মোফিলিক ব্যাকটেরিয়া

খাদ্য গ্রহণে অনিহা ও বৃদ্ধি ব্যাহত: পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মাছের বিপাকক্রিয়া ও হজমক্ষমতা এলোমেলো হয়ে যায় এবং যেসব মাছের পাকস্থলী ও অন্ত্র অসম্পূর্ণ বা ছোট সেসব মাছের হজম প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ে তাপমাত্রা বাড়লে। মাছ খাবার খাওয়া কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে তাদের বৃদ্ধি থমকে যায়।

ক্ষতিকারক অ্যালগির বিস্তার: কড়া রোদে পানিতে ‘অ্যালগাল ব্লুম’ বা শ্যাওলার অতিরিক্ত স্তর তৈরি হয়। এই শ্যাওলাগুলো রাতে পুকুরে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দেয় ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড এর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

গ্রীষ্মের তীব্র গরমে  করণীয় পদক্ষেপ ও পরিচর্যা –

ক) পানি ও অক্সিজেন ঠিক রাখার উপায়

নতুন পানি যোগ করা: পুকুরের পানির গভীরতা কমপক্ষে ৫–৬ ফুট ধরে রাখতে হবে। দুপুরের দিকে বা বিকেলে সম্ভব হলে বাইরে থেকে ভূগর্ভস্থ  ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি পুকুরে সরবরাহ করতে হবে।

এয়ারেটর চালানো: রাতে এবং ভোরবেলা (যখন অক্সিজেনের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি থাকে) পুকুরে এয়ারেটর চালাতে হবে। এয়ারেটর না থাকলে বাঁশ দিয়ে পানিতে পিটিয়ে বা পাম্প দিয়ে ওপর থেকে পানি ফেলে কৃত্রিম ঢেউ তৈরি করতে হবে।

জরুরি ওষুধ: অক্সিজেন সংকট তীব্র হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে পাওয়া যাওয়া অক্সিজেন ট্যাবলেট বা পাউডার পানিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।এক দুই দিন পরপর খাবারের সাথে ভিটামিন সি মিশিয়ে দেওয়া উত্তম।  তীব্র গরমে অসমোরেগুলেশন(Osmoregulation) বা শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে মাছের প্রচুর আয়ন ক্ষয় হয়। তাই গ্রীষ্মে এ সময় খাদ্যের সাথে ১-২% সোডিয়াম ক্লোরাইড (লবণ) বা পটাশিয়াম যুক্ত খনিজ লবণ সরবরাহ করলে মাছের ক্লান্তি দূর হয় এবং রক্তে অক্সিজেনের পরিবাহিতা বাড়ে।

খ) খাদ্য ও সার ব্যবস্থাপনা

খাবারের পরিমাণ কমানো: গরমের দিনগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে খাবারের পরিমাণ ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে হবে। মাছ খাবার না খেলে জোর করে খাবার দেওয়া যাবে না, এতে পানি আরও দ্রুত নষ্ট হবে।

গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যিক ফিডে অপরিশোধিত আঁশ বা ক্রুড ফাইবার ৫-৬% এর নিচে রাখা উচিত। রাইস পলিশ বা গমের ভুষির চেয়ে সহজে হজমযোগ্য কর্ন গ্লুটেন বা সয়াবিন মিলের ব্যবহার গরমে মাছের পরিপাকতন্ত্রকে শান্ত রাখে।

খাবার দেওয়ার সময়: দুপুরের কড়া রোদে কখনোই খাবার দেবেন না। খাবার দিতে হবে সকাল ৭টার আগে এবং বিকেল ৫টার পর, যখন তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে।এবং গরমে পুকুরের তলদেশে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের আধিক্য থাকে। তাই ডুবন্ত খাবারের বদলে ভাসমান খাবার (Floating Feed) দিলে মাছ সহজে তা খেতে পারে এবং তলদেশের পরিবেশ নষ্ট হয় না।

রাসায়নিক ও জৈব সার বন্ধ: তীব্র গরমের সময় পুকুরে যেকোনো ধরনের জৈব সার (গোবর, মুরগির বিষ্ঠা) বা রাসায়নিক সার প্রয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে।

গ) বিষাক্ত গ্যাস ও পানির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ

হররা বা চেইন টানা: পুকুরের তলার গ্যাস বের করে দেওয়ার জন্য ভোরে বা সূর্য ওঠার আগে হালকাভাবে হররা বা চেইন টানতে হবে। তবে মাছ খুব বেশি ক্লান্ত বা ভাসমান থাকলে এটি করা যাবে না।

চুন ও লবণের ব্যবহার: পানির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব ঠিক রাখতে প্রতি শতকে ২০০-২৫০ গ্রাম চুন এবং ২৫০ গ্রাম লবণ গুলে পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে।

ছায়ার ব্যবস্থা: পুকুরের পাড়ে বড় গাছপালা থাকলে তার ডালপালা কিছুটা ছেঁটে দিন যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। তবে দুপুরের তীব্র রোদ থেকে বাঁচাতে পুকুরের এক কোণায় সামান্য কিছু কচুরিপানা বা হিজল গাছ দিয়ে কৃত্রিম ছায়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মাছ চাষে মনে রাখবেন প্রতিকার অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম। মাছ চাষের যেকোনো পরামর্শের জন্য নিকটস্থ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বা মৎস্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।সঠিক পরামর্শ নিন। আর্থিক ক্ষতি থেকে এড়িয়ে চলুন।

লেখকঃ মাছের চাষ, খাদ্য-পুষ্টি, রোগ ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ- কৃষিবিদ মো: ইব্রাহিম মিয়া, বিএসসি ইন ফিশারিজ, এমএসসি ইন অ্যাকুয়াকালচার। মোবাইলঃ 01798687245, ইমেইলঃ 1906014ebrahimmiah@gmail.com