| ময়মনসিংহ অঞ্চলে বছরে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হয়, যার বড় অংশই আসে পাঙাশ থেকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ পাঙাশ চাষকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে অনেক চাষি দিশেহারা হয়ে পড়লেও নতুন এক ভ্যাকসিনের ট্রায়াল ফলাফল তাদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। গবেষকদের আশা, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুনের মধ্যেই ভ্যাকসিনটি বাজারে আসতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে পানির তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে পাঙাশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এ সময় সুযোগ নেয় ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া রোগের জীবাণু, যা পুকুরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত মাছের পেটের নিচে লালচে দাগ দেখা দেয় এবং ভেতরের অঙ্গ, বিশেষ করে লিভার, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক খামারির অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংক্রমণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই পুকুরের বড় অংশের মাছ মারা যেতে পারে। পাঙাশের আরেকটি বড় সমস্যা ইন্টারিক সেপ্টিসেমিয়া অব ক্যাটফিশ (ইএসসি), যার জীবাণু অ্যাডওয়ার্ডসিলা ইক্টালুরি। স্থানীয়ভাবে এটি ‘মাথা পচা’ রোগ নামে পরিচিত। পুকুরের তলদেশে ময়লা জমে অ্যামোনিয়া বেড়ে গেলে এ রোগের প্রকোপ বাড়ে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় চাষিরা নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি পোনা ছাড়েন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অতিরিক্ত ঘনত্বে মাছের বর্জ্য জমে পানিতে অক্সিজেন কমে যায়। দ্রবীভূত অক্সিজেন তিন পিপিএমের নিচে নেমে এলে মাছ চাপে পড়ে এবং সুপ্ত জীবাণু সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে গবেষকেরা আক্রান্ত মাছ থেকে জীবাণু সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করেন এবং সেখান থেকে একটি নিষ্ক্রিয় ভ্যাকসিন তৈরি করেন। আধুনিক ন্যানোপার্টিকেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই ভ্যাকসিন মাঠ পর্যায়েও আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। ভ্যাকসিন প্রয়োগের দুটি পদ্ধতি পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রথমত, মা মাছকে ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হলে সেই মাছ থেকে উৎপন্ন পোনা জন্মগতভাবে কিছু সময় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পায়। দ্বিতীয়ত, সাধারণ খামারিদের সুবিধার জন্য মাছের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে ওরাল ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ পোনার বেঁচে থাকার হার ৫৫–৬০ শতাংশ, সেখানে ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত পোনার ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশেরও বেশি। পরীক্ষাগারে আরও দেখা গেছে, টিকা দেওয়া মাছের শরীরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং চাষকালীন সময়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রকোপ কম থাকে। গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অ্যান্টিবায়োটিক বা পানিতে ওষুধ প্রয়োগ করে এ ধরনের রোগ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। উন্নত চাষ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কার্যকর ভ্যাকসিনই হতে পারে টেকসই সমাধান। মাঠের খামারিরাও ট্রায়াল ফল নিয়ে আশাবাদী। কয়েকজন চাষির অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, টিকা দেওয়া মা মাছ থেকে উৎপাদিত পোনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং মৃত্যুহার আগের তুলনায় অনেক কম। কেউ কেউ জানিয়েছেন, আগে যেখানে পোনা ছাড়ার পর বড় হওয়ার আগেই উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হতো, এখন সেখানে লোকসান প্রায় নেই বললেই চলে। ওরাল ভ্যাকসিন ব্যবহার করা কয়েকটি খামারেও ইতিবাচক ফল মিলেছে। আশপাশের পুকুরে রোগ ছড়িয়ে পড়লেও ভ্যাকসিন দেওয়া মাছ তুলনামূলকভাবে সুস্থ ছিল এবং বৃদ্ধি সন্তোষজনক হয়েছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। সব মিলিয়ে, নতুন ভ্যাকসিনটি বাজারে এলে পাঙাশ খাতের বড় ক্ষতি কমে আসবে এবং বিপর্যস্ত চাষিরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। |







