মাছ চাষে দৃষ্টান্ত কুমিল্লার রহমত ফিশারিজ

চাকরির নিরাপদ জীবনের প্রলোভন না মেনে ২৫ বছর আগে বেছে নিয়েছিলেন এক ভিন্ন পথ। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সিংগুলা দিঘিরপাড় গ্রামের যুবক রহমত আলী সরকার তখন চাকরির বদলে হাতে নিয়েছিলেন মাছ চাষের দা-জাল। সিদ্ধান্তটা সবার কাছে ছিল অবাক করা—পরিবারের আপত্তি, প্রতিবেশীর কটুকথা, চারপাশের উপহাস; সবকিছুই সামলাতে হয়েছে তাঁকে। তবে দমে যাননি রহমত। নিজের স্বপ্ন আর অধ্যবসায়ের জোরে আজ তিনি সফল মৎস্য চাষি। হয়েছেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সফল মৎস্য উদ্যোক্তাও।

স্বপ্নের শুরু ছোট্ট ডোবা থেকেঃ ১৯৯৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর হাতে-কলমে মাছ চাষের প্রশিক্ষণ নেন টানা দুই বছর। পরিবার তাঁকে চাকরি করার পরামর্শ দিলেও মন টিকল না। অবশেষে ২০০০ সালের দিকে দাউদকান্দির রায়পুর সেতুর পাশে মাত্র ৩০ শতক ডোবা ইজারা নেন। পুঁজি ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। সেখান থেকেই শুরু তাঁর মৎস্য চাষের যাত্রা। আশ্চর্যের বিষয়, প্রথম বছরেই তিনি লাভবান হন। সাফল্যের হাতেখড়ি তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

ক্ষুদ্র পুকুর থেকে বিশাল প্রকল্পঃ ধাপে ধাপে পুকুর বাড়তে থাকে। এখন রহমত আলীর অধীনে প্রায় ৪০ হেক্টর জমিতে মাছ চাষ চলছে। রয়েছে ২০টি পুকুর ও চারটি প্লাবনভূমির প্রকল্প। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রহমত ফিশারিজ’-এ পাঙাশ, শিং, কই, বাটা, রুই, কাতলা, মৃগেল, কার্পজাতীয় মাছ ও তেলাপিয়া চাষ হয়। প্রতিবছর এখান থেকে চার কোটির বেশি টাকার মাছ বিক্রি হয়।

জাতীয় স্বীকৃতিঃ মৎস্য খাতে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের পুরস্কার। গত ১৮ আগস্ট ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন। এর আগে উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি।

কর্মসংস্থান ও সমাজসেবাঃ শুধু নিজের উন্নতিই নয়, রহমত আলী ভেবেছেন সমাজের কথাও। তাঁর ফার্মে নিয়মিত কাজ করেন ৬০ জন শ্রমিক। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে ৬০টি পরিবারের। নিজের আয় থেকে তিনি গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ান, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেন। এমনকি উৎপাদিত কিছু রেণুপোনা জনস্বার্থে উন্মুক্ত জলাশয়ে ছেড়ে দেন। রায়পুর কে সি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, “রহমত আলী প্রতিবছর গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ সহায়তা দেন। সমাজের সবাই যদি এভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়া থেকে বাঁচবে।”

তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণাঃ চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন রহমত আলী। তাঁর মতে, উদ্যোক্তা হলে শুধু স্বাবলম্বী হওয়া যায় না, বরং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়, দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়। ফারুক আহমেদ নামের এক তরুণ উদ্যোক্তা জানান, রহমত আলীকে দেখে তিনি মাছ চাষ শুরু করেছেন। উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াছমিন চৌধুরী বলেন, “রহমত ফিশারিজ এখন বেকারদের স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম মডেল। তরুণদের তাঁর পথ অনুসরণ করা উচিত।”

যেখানে অনেকেই প্রতিবন্ধকতায় থেমে যান, সেখানে রহমত আলী তাঁর আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্যের জোরে গড়ে তুলেছেন সফলতার গল্প। আজ তাঁর নাম শুধু মৎস্য উদ্যোক্তা নয়, বরং অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবেও উচ্চারিত হয়।