মিশ্র পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে

কার্প মাছের সঙ্গে পুকুরে মিশ্র-সংস্কৃতি পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এই পদ্ধতিতে চাষ করা চিংড়ি ছয় মাসের মধ্যে ১২০–১২৫ গ্রাম ওজনে পৌঁছে যায়, যা স্থানীয় বাজারে খুব ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে চাষিরা উল্লেখযোগ্য লাভ অর্জন করছেন।

মৎস্য অধিদপ্তর (ডিওএফ) আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ ও তৃণমূল পর্যায়ের চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে স্বাদুপানিতে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। অধিদপ্তর প্রদর্শনী পুকুর স্থাপন করেছে এবং লাভজনক উদ্যোগ হিসেবে আধুনিক চাষপদ্ধতি গ্রহণে চাষিদের উৎসাহিত করছে।

নওগাঁ জেলার সদর উপজেলার দিঘিপাড়া গ্রামের চাষি রাজু সারদার এ ধরনের মিশ্র-সংস্কৃতি চাষে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। গত বছরের জুন মাসে তিনি ১,৫০০টি চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করে কার্প মাছের সঙ্গে মিশ্রভাবে চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্রতি কেজিতে সাত থেকে আটটি চিংড়ি পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান।

গণমাধ্যমকে রাজু সারদার বলেন, এখন থেকে তিনি প্রায় ১৩০ কেজি চিংড়ি উৎপাদনের আশা করছেন, যার বাজারমূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে হবে। বর্তমানে চিংড়ি প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মিশ্র-সংস্কৃতি পদ্ধতি গ্রহণের ফলে একই পুকুর থেকে দ্বিগুণ লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাজু সারদারের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় মাছচাষি চপল সাহা ও সাইফুল ইসলামও এ ধরনের চাষ শুরু করেছেন।

রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার কর্ণহার গ্রামের আরেক চিংড়ি চাষি মনিরুল ইসলাম জানান, তিনি হ্যাচারি থেকে পোস্ট-লার্ভা সংগ্রহ করেন এবং অনেক চাষি তার কাছ থেকে চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করছেন।

চাষি শাফিউল আলম বলেন, রাজশাহীতে লার্ভা ও পোস্ট-লার্ভা উৎপাদন শুরু হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চিংড়ি চাষ দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে। তিনি আরও জানান, এ অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং প্রোটিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

এর আগে মৎস্য অধিদপ্তর প্রায় ৭৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩.২৯ হেক্টর আয়তনের ফিশ সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম প্রাঙ্গণে একটি আধুনিক চিংড়ি প্রজনন হ্যাচারি নির্মাণ করে। বিদ্যমান পোনা সংকট দূর করে চিংড়ি চাষকে আরও জনপ্রিয় করে তুলতেই এ হ্যাচারি স্থাপন করা হয়েছে।

রাজশাহীর রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রজনন হ্যাচারি সুস্থ ও মানসম্মত পোনা সরবরাহের মাধ্যমে স্বাদুপানিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। গত বছর এ হ্যাচারি সফলভাবে সাড়ে তিন লাখের বেশি পোস্ট-লার্ভা উৎপাদন করে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকার চাষিদের মধ্যে বিতরণ করে।

ফিশ সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্মের ব্যবস্থাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর ধরে হ্যাচারিতে লার্ভা ও পোস্ট-লার্ভা উৎপাদন করে তা চাষিদের মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা থেকে লবণাক্ত পানি সংগ্রহ করা হয় এবং এপ্রিল মাসে পিরোজপুর জেলার কোচা নদী থেকে দুই ধাপে ২০০টি ব্রুড চিংড়ি সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো জীবাণুমুক্ত করে লবণাক্ত পানিতে নার্সিং করা হয়। তিনি আরও জানান, লার্ভা পর্যায় থেকে পোস্ট-লার্ভা উৎপাদন পর্যন্ত পুরো নার্সিং সময়ে কঠোরভাবে বায়ো-সিকিউরিটি বজায় রাখা হয়, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মৎস্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহইয়া বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে স্বাদুপানিতে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ করাই অধিদপ্তরের লক্ষ্য। বিভিন্ন চাহিদাভিত্তিক কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে পোনা ও রেণুর চাহিদা পূরণ করা হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।