| নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের পোল্ট্রি শিল্পে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রাণিজ প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস পোল্ট্রি মিল উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে গাজীপুরের জয়দেবপুরের পাটপাঁচা, ভবানীপুর এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি স্থাপন করে বাণিজ্যিকভাবে পোল্ট্রি মিল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে ইকো আরবান লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ‘ইকো পোল্ট্রি মিল’ নামে আজ ২৩ আগস্ট ২০২৬, রবিবার সকাল ১১টায় কারখানা প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
ইকো আরবান লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে নিবন্ধিত পোল্ট্রি ফিড মিলের সংখ্যা প্রায় ২৪৯টি। এর মধ্যে বড় পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৮০টির মতো। এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ লাখ টন ফিড উৎপাদিত হয়। বিপুল এই ফিড উৎপাদনে প্রয়োজনীয় প্রাণিজ প্রোটিনের একটি উল্লেখযোগ্য উপাদান পোল্ট্রি মিল, যার বড় অংশই বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তিনি বলেন, দেশের পোল্ট্রি ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ও উপজাত পাওয়া যায়। এসব বর্জ্য বৈজ্ঞানিকভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে স্থানীয়ভাবেই দেশের প্রয়োজনীয় পোল্ট্রি মিলের একটি বড় অংশ উৎপাদন করা সম্ভব। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যমান বর্জ্য সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশের পোল্ট্রি মিলের চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে পূরণের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ইকো আরবান লিমিটেড দৈনিক ২০ টন পোল্ট্রি মিল উৎপাদন সক্ষমতা সম্পন্ন একটি আধুনিক শিল্প স্থাপনা নির্মাণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উৎপাদিত পোল্ট্রি মিল পোল্ট্রি, মৎস্য ও অন্যান্য প্রাণিখাদ্যে প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
পোল্ট্রি মিল মূলত মুরগি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জবাই কার্যক্রম থেকে পাওয়া বিভিন্ন উপযোগী উপজাতকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয়। এতে প্রাণিজ প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে। সঠিক মান বজায় রেখে উৎপাদিত পোল্ট্রি মিল পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডে প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে ফিডের পুষ্টিমান বজায় রাখার পাশাপাশি আমদানি করা প্রাণিজ প্রোটিন উপাদানের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে পোল্ট্রি ফিডের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি মিলের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অথচ আমাদের দেশেই এই পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় একটি উৎস রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে পোল্ট্রি মিল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছি।” তিনি আরও বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা নয়; বরং পোল্ট্রি শিল্পের বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে একটি সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলা। অর্থাৎ পোল্ট্রি ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত থেকে উৎপন্ন উপযোগী বর্জ্য সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আবার প্রাণিখাদ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্তঃ পোল্ট্রি শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুরগির মৃতদেহ, নাড়িভুঁড়ি, পালক ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাতকরণ উপজাত সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হলে দুর্গন্ধ, জীবাণু বিস্তার, মাটি ও পানি দূষণসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হতে পারে। ইকো আরবান লিমিটেডের উদ্যোগে এসব উপযোগী বর্জ্যকে ফেলে না দিয়ে মূল্যবান প্রাণিজ প্রোটিনে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশের ওপর বর্জ্যের চাপ কমবে, অন্যদিকে বর্জ্য থেকে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হবে। তবে পোল্ট্রি মিল উৎপাদনে জীবাণু নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামালের নিরাপদ সংগ্রহ, যথাযথ তাপ প্রয়োগ, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ এবং নিয়মিত ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মতো বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রক্রিয়াজাত করা বর্জ্য খাদ্যশৃঙ্খলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে মানসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা ও কঠোর কোয়ালিটি কন্ট্রোল এ শিল্পের টেকসই বিকাশের অন্যতম শর্ত। সবুজ পরিবেশের মধ্যে শিল্প স্থাপনাঃ ইকো আরবান লিমিটেড-এর প্রকল্পটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অবস্থান। গাজীপুরের জয়দেবপুরের পাটপাঁচা, ভবানীপুর এলাকায় সবুজে ঘেরা এবং প্রচুর গাছপালার কাছাকাছি পরিবেশে প্রকল্পটি স্থাপন করা হয়েছে। শিল্পায়নের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ কর্মপরিবেশ তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের চারপাশের গাছপালা ও সবুজ আবহাওয়ার কারণে এলাকাটি একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ধরে রেখেছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এমন সবুজ বেষ্টনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কর্মীদের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক কর্মপরিবেশ তৈরিতেও সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক শিল্পের ক্ষেত্রে দুর্গন্ধ, বর্জ্য নিষ্কাশন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবুজ পরিবেশের মধ্যে প্রকল্পটি পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য সংরক্ষণ, বর্জ্য পরিবহন এবং উৎপাদন এলাকার স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা হলে এটি পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনার একটি উদাহরণ হতে পারে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অবদানঃ দেশে পোল্ট্রি মিল উৎপাদন বাড়লে সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হতে পারে আমদানি নির্ভরতা কমানো। স্থানীয়ভাবে প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস তৈরি হলে বিদেশ থেকে আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পোল্ট্রি ও মৎস্য ফিড শিল্পের জন্য স্থানীয় একটি কাঁচামাল উৎস তৈরি হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আসতে পারে। বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কারখানা পরিচালনা ও বিপণন ঘিরে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, পোল্ট্রি শিল্পের বর্জ্যকে মূল্যবান কাঁচামালে পরিণত করার ফলে বর্জ্যের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হবে। এতে পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রেন্ডারিংভিত্তিক একটি নতুন সহায়ক শিল্পখাতও বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইকো আরবান লিমিটেড- এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, দেশে উৎপন্ন পোল্ট্রি বর্জ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এটি একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে, অন্যদিকে দেশের ফিড শিল্পের জন্য নতুন একটি স্থানীয় প্রোটিন উৎস তৈরি করবে। আমাদের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিরাপদ ও মানসম্মত পোল্ট্রি মিল উৎপাদন করা।” তিনি জানান, দৈনিক ২০ টন উৎপাদন সক্ষমতার এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রবেশ করছেন। ভবিষ্যতে বাজারের চাহিদা ও কাঁচামালের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে উৎপাদন সক্ষমতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। পোল্ট্রি শিল্পে নতুন অধ্যায়ঃ দেশের পোল্ট্রি শিল্প বর্তমানে বৃহৎ একটি অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। ডিম, মাংস ও ফিড উৎপাদনের পাশাপাশি এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপখাতও ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে ফিডের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল উৎপাদন এবং বর্জ্যকে পুনরায় শিল্পের সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে এ খাতের ব্যয়, পরিবেশ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আজ ২৩ আগস্ট-২০২৬ উদ্বোধনের মাধ্যমে ইকো আরবান লিমিটেড-এর ‘ইকো পোল্ট্রি মিল’ ব্রান্ড নামে বাণিজ্যিক উৎপাদনে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। দেশের পোল্ট্রি শিল্পের বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস তৈরির লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্প ভবিষ্যতে দেশের ফিড শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। ইকো আরবান লিমিটেডের কারখানা গাজীপুরের জয়দেবপুরের পাটপাঁচা, ভবানীপুরে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলামের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে নির্মিত এ প্রকল্পে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাকিবুল হাসানসহ কোম্পানির অন্যান্য পরিচালকও সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিদের উপস্থিতিতে একমকালো অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। |









