নিবন্ধন ছাড়া প্রাণী প্রজনন সেবা নয়, খসড়া আইনে কঠোর শাস্তি

গবাদিপশুর জেনেটিক উন্নয়ন, দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন এবং দেশীয় প্রাণিজ জেনেটিক সম্পদ সংরক্ষণে দেশে প্রথমবারের মতো প্রাণী প্রজনন কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশ প্রাণী প্রজনন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত আইনে প্রাণী প্রজনন খাতে নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি অনিয়মের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তির পরিমাণ দ্বিগুণ করার প্রস্তাবও রয়েছে।

খসড়া আইনের আওতায় গবাদিপশুর প্রজনন ষাঁড় নির্বাচন, সিমেন উৎপাদন ও সংরক্ষণ, ভ্রূণ স্থানান্তর, ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ), জিনোমিক নির্বাচন, জাত নিবন্ধন, জেনেটিক মূল্যায়ন, প্রজনন উপকরণের ক্রয়-বিক্রয়, আমদানি-রপ্তানি এবং কৃত্রিম প্রজননসহ সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

নিবন্ধন ছাড়া প্রজনন সেবা নয়: প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী বৈধ নিবন্ধন সনদ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গবাদিপশুর সিমেন, ভ্রূণ বা ডিম্বাণু উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি কিংবা কেনাবেচা করতে পারবে না। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকে সরকার নির্ধারিত প্রজনন মানদণ্ড মেনে সেবা দিতে হবে। নিবন্ধিত সেবার ধরন বা গুণগত মান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা বা ভুয়া তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বুল স্টেশন ও আইভিএফ ল্যাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ: আইন কার্যকর হলে অনুমোদন ছাড়া কোনো বুল স্টেশন, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, সিমেন ব্যাংক, ভ্রূণ উৎপাদন বা গবেষণাগার স্থাপন ও পরিচালনা করা যাবে না। একইভাবে কৃত্রিম প্রজনন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (এআইটিআই) এবং প্রাণী প্রজননে ব্যবহৃত সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (এআরটি) সেবাকেও নিবন্ধনের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, বেসরকারি সংস্থা বা সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ও নিবন্ধন ছাড়া বুল স্টেশন পরিচালনা করতে পারবে না। নিবন্ধনের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল, জৈবনিরাপত্তা, প্রাণীকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক পরীক্ষাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে।

অনুমোদিত ষাঁড় ছাড়া সিমেন উৎপাদন নিষিদ্ধ: বাণিজ্যিকভাবে সিমেন সংগ্রহ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা বাজারজাত করতে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিবন্ধিত বুল স্টেশনকে প্রতিটি প্রজনন ষাঁড়ের জন্য পৃথক সনদের আবেদন করতে হবে। ‘জাতীয় কারিগরি নিয়ন্ত্রক কমিটি’র সুপারিশের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি প্রত্যয়িত ষাঁড়কে একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর দেবে। প্রত্যয়িত ষাঁড় ছাড়া অন্য কোনো ষাঁড় থেকে সিমেন উৎপাদন নিষিদ্ধ থাকবে। সংগৃহীত সিমেন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। প্রতিটি সিমেন স্ট্রোতে ষাঁড়ের পরিচিতি নম্বর, উৎপাদনের তারিখ, উৎপাদন কেন্দ্রের নাম এবং কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত অন্যান্য তথ্য উল্লেখ থাকতে হবে।

সিমেন ব্যাংক ও জিন ব্যাংকে সংরক্ষণ: খসড়ায় জাতীয়, আঞ্চলিক বা বিশেষায়িত সিমেন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নিবন্ধিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে সিমেন ব্যাংক স্থাপন করতে পারবে। সংরক্ষিত সিমেনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বা মুদ্রিত রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে। পাশাপাশি নিবন্ধিত বুল স্টেশনে ব্যবহৃত প্রত্যয়িত ষাঁড়ের সিমেনের নির্দিষ্ট পরিমাণ নমুনা দীর্ঘমেয়াদে জিন ব্যাংকে সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে।

এক বছরের মধ্যে নিবন্ধন নিতে হবে পুরোনো প্রতিষ্ঠানকে: আইন কার্যকর হওয়ার সময় যেসব বুল স্টেশন, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র, সিমেন উৎপাদন কেন্দ্র, সিমেন ব্যাংক, ভ্রূণ গবেষণাগার ও অন্যান্য নিবন্ধনযোগ্য প্রতিষ্ঠান চালু থাকবে, সেগুলোকে এক বছরের মধ্যে নতুন আইনের অধীনে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধন সনদের মেয়াদ হবে এক বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে। যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও আবেদন বিবেচনার সুযোগ থাকবে।

অনিয়মে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড: প্রস্তাবিত আইনে নিম্নমানের, ভেজাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ প্রজনন উপকরণ উৎপাদন ও কেনাবেচা, জেনেটিক মূল্যায়নে মিথ্যা তথ্য প্রদান, বংশগত ত্রুটিযুক্ত প্রাণী প্রজননে ব্যবহার এবং অনুমতি ছাড়া দেশীয় প্রজনন সম্পদ বিদেশে পাচার বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাণীর শনাক্তকরণ নম্বর, ইয়ার ট্যাগ বা ডিএনএ পরিচয় বিকৃত করা, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং সরকারি পরিদর্শনে বাধা দেওয়াও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত সিমেন, প্রাণী, সরঞ্জাম ও পরিবহনযান আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে। তবে গুরুতর নয় এমন অপরাধের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারবে। অর্থদণ্ড আরোপের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

১৭ সদস্যের কারিগরি নিয়ন্ত্রক কমিটি: আইনের বাস্তবায়নে ১৭ সদস্যের ‘জাতীয় কারিগরি নিয়ন্ত্রক কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নিবন্ধিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং প্রজনন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটি প্রজনন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও নথিপত্র সরেজমিনে যাচাই করে নিবন্ধনের বিষয়ে সুপারিশ করবে। কমিটিতে থাকা বেসরকারি সদস্যদের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং তারা পুনঃনিয়োগের যোগ্য হবেন।

লাইসেন্স বাতিলের আগে শুনানির সুযোগ: ভুল তথ্য বা জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধন নেওয়া, সনদের শর্ত ভঙ্গ করা কিংবা আইনের বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করা যাবে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের আগে কারণ দর্শানো এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। কর্তৃপক্ষের কোনো আদেশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আদেশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। আপিল কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।

কোম্পানির অপরাধে কর্মকর্তাদের দায়: কোনো কোম্পানি, সমবায় সমিতি, অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো আইনগত সত্তা আইনের অধীনে অপরাধ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, পরিচালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দায়ী করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে অপরাধটি তার অজ্ঞাতে সংঘটিত হয়েছে অথবা অপরাধ প্রতিরোধে তিনি যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তাহলে তিনি দায়মুক্ত হতে পারবেন।

মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে খসড়া: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশ প্রাণী প্রজনন আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত চাওয়া হয়েছে। কোনো মতামত বা পরামর্শ থাকলে তা ১০ কর্মদিবসের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত হয়ে আইন হিসেবে কার্যকর হলে প্রাণী প্রজনন খাতে নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ, জেনেটিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং প্রজনন উপকরণের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।